বৈশ্বিক দূষণে তৃতীয় স্থানে ঢাকা: নিঃশ্বাসেরও মূল্য এখন বিপজ্জনক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
বৈশ্বিক দূষণে তৃতীয় স্থানে ঢাকা: নিঃশ্বাসেরও মূল্য এখন বিপজ্জনক

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের নগরায়ণের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ঢাকাও এখন আরেকটি দিক থেকে নিয়মিত শিরোনামে আসছে—বায়ুদূষণের ভয়াবহতায়। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ার (IQAir) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান বর্তমানে তৃতীয়। সোমবার সকাল ৮টায় প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ঢাকার বায়ুর মান সূচক (AQI) স্কোর ২৫৮, যা ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। এই সূচক অনুযায়ী, ঢাকার বাতাসে এখন প্রতিটি নিঃশ্বাসই ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষত শিশু, বৃদ্ধ এবং শ্বাসযন্ত্রের রোগীদের জন্য।

বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের এই তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লি, যার স্কোর ৬৪৯, যা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ পর্যায়ের। দ্বিতীয় অবস্থানে পাকিস্তানের লাহোর, যার স্কোর ৩৫৬। ঢাকার নিচেই চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ভারতের কলকাতা, স্কোর ২২৪ এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে বসনিয়ার সারাজেভো, স্কোর ১৮৪।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুমান সূচক (AQI) ৫০-এর নিচে থাকলে সেটি ‘ভালো’, ৫১ থেকে ১০০ হলে ‘সহনীয়’, ১০১ থেকে ১৫০ পর্যন্ত ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’, ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০০-এর উপরে গেলে সেটি ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে গণ্য হয়। ঢাকার স্কোর ২৫৮ হওয়ায় এটি বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে আছে, যেখানে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করা মানেই ফুসফুস, হার্ট, ও শ্বাসযন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণ এখন একটি অবিরাম জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। নগরীর প্রতিদিনের দৃশ্য—ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের বর্জ্য, শিল্প এলাকার ধোঁয়া, ইটভাটা—সব মিলিয়ে বাতাস এখন এক ধরনের বিষাক্ত মিশ্রণে পরিণত হয়েছে। শহরের অনেক এলাকাতেই সকাল-বিকেল ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে, যা কেবল চোখ জ্বালাপোড়া বা কাশি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ফুসফুস ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ঢাকায় বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম। নগরের প্রায় প্রতিটি রাস্তায় বড় ছোট নির্মাণকাজ চলমান, কিন্তু সেসব প্রকল্পের অধিকাংশেই ধুলা ও বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেই। খোলা ট্রাকে বালি, সিমেন্ট, ইট-বালি পরিবহন, পাশাপাশি সড়কগুলোতে খনন ও পুনঃখননের কারণে বায়ুর মান ক্রমেই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বায়ুদূষণের বড় উৎস হলো ইটভাটা। রাজধানী ও আশেপাশের জেলায় ছড়িয়ে থাকা প্রায় তিন হাজারেরও বেশি ইটভাটার অধিকাংশই পরিবেশ আইন মানছে না। এসব ভাটার পুরনো প্রযুক্তি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এবং কণামাত্রা (PM2.5 ও PM10) বাতাসে বিষাক্ত উপাদান বাড়াচ্ছে।

এ ছাড়া যানবাহনের ধোঁয়াও দূষণের একটি প্রধান উৎস। ঢাকায় প্রতিদিন লাখো যানবাহন চলে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই পুরনো এবং উচ্চমাত্রার ধোঁয়া নির্গত করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব যানবাহন থেকে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও সালফার যৌগ নির্গত হয়, যা মানুষের শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বাতাসে এখন যে পরিমাণ ক্ষুদ্র কণামাত্রা (PM2.5) রয়েছে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমার অন্তত ১০ গুণ বেশি। এ ধরনের কণামাত্রা এতটাই সূক্ষ্ম যে, তা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তে মিশে যেতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, কাশি, এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

ঢাকার মতো একটি ব্যস্ত মহানগরে বায়ুদূষণ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং অর্থনৈতিক ক্ষতিরও বড় কারণ হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বায়ুদূষণজনিত অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর কারণে প্রতি বছর জাতীয় জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে। রোগে ভোগা, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে এই ক্ষতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

পরিবেশবিদরা মনে করেন, বায়ুদূষণ রোধে এখন সময় এসেছে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, পুরনো যানবাহন প্রত্যাহার, নগর নির্মাণে ধুলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, এবং নগরের সবুজায়ন বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ অবিলম্বে না নিলে ভবিষ্যতে ঢাকার অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে পারে।

তারা সতর্ক করেছেন, বায়ুদূষণ এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার ও টিকে থাকার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। পরিষ্কার বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার, কিন্তু ঢাকায় সেই অধিকার আজ বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন বায়ুমান উন্নয়নে নানা উদ্যোগের কথা বলছে, বাস্তবে সেই কার্যকারিতা দৃশ্যমান নয়। ধুলা-নিয়ন্ত্রণে ওয়াটার স্প্রে, সড়ক পরিষ্কারকরণ কিংবা ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ অভিযান—সবকিছুই মৌসুমি বা প্রতীকী উদ্যোগে সীমিত থেকে যাচ্ছে। ফলে ঢাকার নাগরিকরা প্রতিদিন নিজেদের অজান্তেই শ্বাস নিচ্ছেন এক বিষাক্ত বাতাসে।

বিশ্ব যখন পরিচ্ছন্ন শক্তি, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই নগরায়ণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন ঢাকার বাস্তবতা এক ভয়াবহ বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার—কারণ, যদি বাতাসই থাকে না, তাহলে শহরের বিকাশ, উন্নয়ন, কিংবা ভবিষ্যৎ কোনো পরিকল্পনাই টেকসই হবে না।

ঢাকার বায়ুদূষণ এখন কেবল একটি শহরের সমস্যা নয়, বরং এটি গোটা জাতির শ্বাস-প্রশ্বাসের সংকট—এক এমন যুদ্ধ, যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসই এখন জীবনের মূল্য বহন করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত