বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক নাঈম রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ: উদ্বেগে পরিবার ও সহকর্মীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৫ বার
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক নাঈম রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক নাঈম রহমানের নিখোঁজ হওয়ায় তার পরিবার, সহকর্মী ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। গতকাল রোববার দুপুর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ মোবাইল ফোনের লোকেশন অনুযায়ী, রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকায় দুপুর ১২টা ৫৩ মিনিটে তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর থেকে ফোন বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি আর কারো সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।

সূত্র জানিয়েছে, নাঈম রহমান প্রতিদিনের মতোই রোববার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়মিত সময়ে উপস্থিত হন। সকালটি স্বাভাবিকভাবেই কাটলেও দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ করে তিনি নিজের অফিস ডেস্কে ব্যাগ, অফিস আইডি কার্ড ও মোবাইল চার্জার রেখে বাইরে চলে যান। এরপর আর তিনি ফিরে আসেননি। দুপুর ১২টা ৫৩ মিনিটে তিনি তার এক ঘনিষ্ঠ সহকর্মীকে শেষবারের মতো একটি বার্তা পাঠান, যা এখন নাঈমের মানসিক অবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বার্তাটিতে তিনি লিখেছিলেন, “আমার ছোট বোনটার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিও। এটা হয়তো আমার শেষ অনুরোধ।” সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর এই মেসেজটি তার সহকর্মীকে হতবাক করে দেয়। বার্তাটি পাওয়ার কিছু সময় পরই তার ফোন বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকে তার কোনো খোঁজ মেলেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি ও অতিরিক্ত পরিচালক মাসুম বিল্লাহ জানান, “আমরা সবাই নাঈমের খোঁজে আছি। তিনি অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত-স্বভাবের এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন। তার এই নিখোঁজ হওয়া আমাদের সবার জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়। আমরা আশা করছি তিনি নিরাপদে ফিরে আসবেন।”

মাসুম বিল্লাহ আরও জানান, “নাঈম তার পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্য। মা, স্ত্রী, এক কন্যা ও ছোট বোনকে নিয়ে তিনি রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন। পরিবারের সদস্যরা এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। তার মা সারাক্ষণ ছেলের নাম ধরে কাঁদছেন, স্ত্রী ও ছোট বোনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।”

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নাঈম সম্প্রতি কিছু আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক টানাপোড়েনে ভুগছিলেন। তিনি কর্মজীবনে দায়িত্বশীল হলেও ব্যক্তিগত জীবনে চাপের মধ্যে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবারের ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, তিনি সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটাই চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন, কারো সঙ্গে খুব বেশি কথা বলতেন না। তবে কেউই ভাবতে পারেননি যে তিনি এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাবেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সূত্রে জানা গেছে, নাঈম রহমানের পরিবারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। পুলিশ তার মোবাইল ফোনের শেষ লোকেশন ট্র্যাক করে সায়েদাবাদ ও এর আশপাশের এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এছাড়া আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, “আমরা বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তার অবস্থান শনাক্তের জন্য একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। আমরা আশা করছি খুব শিগগিরই কিছু পাওয়া যাবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষও বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নাঈম রহমানের অফিসের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, তিনি সব সময় হাসিখুশি থাকতেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। সাম্প্রতিক সময়ে কাজের চাপ থাকলেও তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা কেউ লক্ষ্য করেননি।

নাঈম রহমান প্রায় এক যুগ ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। সহকর্মীরা বলছেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সত্‍ ও দক্ষ কর্মকর্তা। তার দায়িত্ব ছিল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগের কার্যক্রম তদারকি করা। পেশাগত জীবনে তিনি সবসময়ই সততার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

নাঈমের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, “গত এক মাস ধরে ওর মধ্যে একটা বিষণ্ণতা লক্ষ্য করছিলাম। চাকরির চাপ, পরিবারের দায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ও বেশ চিন্তিত ছিল। কিন্তু আমরা কেউই ভাবিনি যে ও এমন কিছু করবে।”

এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সহকর্মী, ব্যাংক কর্মকর্তা, এমনকি সাধারণ নাগরিকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করে নাঈমের দ্রুত সন্ধান কামনা করছেন। ফেসবুক, এক্স (টুইটার) ও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে তার ছবি ও বিবরণ শেয়ার করে মানুষ অনুরোধ জানাচ্ছেন—যদি কেউ তাকে দেখে থাকেন, তাহলে যেন দ্রুত নিকটস্থ থানায় বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। নাঈম রহমান আমাদের পরিবারেরই একজন। তার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।”

মানবিক দিক থেকে এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব কতটা অবহেলিত, সেটিরও এক করুণ প্রতিচ্ছবি। সহকর্মী ও বন্ধুদের অনেকে মন্তব্য করেছেন, কর্মজীবনের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক প্রত্যাশার ভার অনেক সময় একজন মানুষকে চরম মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। একজন কর্মীর আচরণ বা মনের পরিবর্তন নজরে এলে তা উপেক্ষা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া উচিত।

এদিকে, নাঈম রহমানের নিখোঁজের খবরে ব্যাংকের সহকর্মী মহলে এক ধরনের নীরবতা নেমে এসেছে। অনেকেই অফিসে বসে কাজ করতে পারছেন না, যেন এক অজানা উদ্বেগ সবাইকে গ্রাস করে ফেলেছে।

সবার মুখে একটাই কথা—“নাঈম ভাই ফিরে আসুক, যেভাবেই হোক নিরাপদে ফিরে আসুক।”

তার স্ত্রী জানিয়েছেন, “ও খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ। কখনো কাউকে কষ্ট দেয়নি। শুধু চাই, ও যেন সুস্থভাবে ফিরে আসে। ও ছাড়া আমাদের কিছুই নেই।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উপপরিচালকের নিখোঁজ রহস্য এখন পুরো রাজধানীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মানুষ প্রার্থনা করছে—যে মানুষটি সারাজীবন আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করেছেন, তিনি যেন নিজের জীবনের শৃঙ্খলা হারিয়ে না ফেলেন।

এখন সময় বলবে—নাঈম রহমান কোথায়, কেমন আছেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—তার অনুপস্থিতি শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি প্রতিষ্ঠানেরও গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। পুরো দেশ এখন তার নিরাপদ ফেরার অপেক্ষায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত