প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ময়মনসিংহ নগরীর সকালটা ছিল শান্ত, স্বাভাবিক দিনের মতোই ব্যস্ত। কিন্তু সকাল আটটার দিকে নগরের দীঘারকান্দা ঢাকা বাইপাস এলাকায় হঠাৎই শোরগোল শুরু হয়। সড়কে দেখা যায় হাতে ব্যানার, মুখে স্লোগান—ছাত্রলীগের একটি ঝটিকা মিছিল চলছে। অথচ সংগঠনটি বর্তমানে নিষিদ্ধ! মাত্র দুই মিনিটের এই আকস্মিক মিছিল মুহূর্তেই চাঞ্চল্য ছড়ায় পুরো শহরে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আদিত্য আহমেদ (পলাশ)। তাঁদের হাতে ‘ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগ’ লেখা একটি ব্যানার। মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা ১৫ থেকে ২০ জনের মতো, কারও মুখে মাস্ক, কারও মাথায় হেলমেট, যেন কেউই সহজে চেনা না পড়ে। তাঁরা হঠাৎ করে সড়কে প্রবেশ করে জোরালো স্লোগানে মিছিল শুরু করেন, এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সরে যান।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে কিছুক্ষণ পর, যখন আত্মগোপনে থাকা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. আল আমিন তাঁর নিজস্ব ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করেন। ভিডিওটির দৈর্ঘ্য ১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ড। এতে দেখা যায়, মিছিলকারীরা সরকারের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছেন এবং সংগঠনের সক্রিয় উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।
এই ভিডিও প্রকাশের পর থেকেই শহরে শুরু হয় নানা আলোচনা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক—সবার মধ্যে কৌতূহল, কীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠনের এমন প্রকাশ্য মিছিল সম্ভব হলো? অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন প্রশাসনের নজরদারি নিয়েও।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শিবিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা মিছিলের খবর পেয়েছি, তবে কখন এটি হয়েছে, তা নিশ্চিত নই। ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ পুলিশ পাঠানো হয়, কিন্তু কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি।” পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভিডিওটি প্রকাশের পর থেকেই তারা ভিডিওর অংশবিশেষ বিশ্লেষণ করছে, যাতে মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়।
নগরের স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে করা হতে পারে। একজন দোকানদার বলেন, “সকাল আটটার দিকে দেখি কয়েকজন তরুণ হঠাৎ করে মিছিল শুরু করল। সবাই মুখ ঢেকে রেখেছিল, তাই চিনতে পারিনি। দুই মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে তারা চলে গেল।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি মিছিল নয়, বরং নিষিদ্ধ সংগঠনের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার প্রতীকী প্রচেষ্টা। স্থানীয় এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যে সময়ে প্রশাসন ছাত্ররাজনীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেই সময় এমন মিছিলের অর্থ অনেক গভীর। এটি হতে পারে সংগঠনের ভেতরের একটি বার্তা—‘আমরা এখনো আছি।’”
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে সাহসিকতা হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন, নিষিদ্ধ সংগঠনের এমন কর্মকাণ্ড আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তারা কীভাবে প্রকাশ্যে মিছিল করে? আইন কি কেবল সাধারণ মানুষের জন্য?”
অন্যদিকে কিছু তরুণ সমর্থক এই মিছিলকে ‘সংগঠনের পুনর্জাগরণের প্রতীক’ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের দাবি, ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মী অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, তাই তাঁরা নিজেদের উপস্থিতি জানাতে বাধ্য হয়েছেন।
বাফুফে বা কোনো কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সূত্র থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনটির কিছু অংশ এখনও কেন্দ্রের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে, আর এই মিছিল হয়তো কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগের একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “ভিডিও বিশ্লেষণ চলছে। কারও মুখ বা পোশাক দেখে আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি। খুব শিগগিরই মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে সাধারণ মানুষও এখন শঙ্কিত। অনেকে মনে করছেন, এমন ঘটনা যদি প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘটতে পারে, তবে এটি ভবিষ্যতে বড় কোনো বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত হতে পারে। ময়মনসিংহের এক কলেজ শিক্ষক বলেন, “নিষিদ্ধ সংগঠন মানেই নিষিদ্ধ কার্যক্রম। তবুও তারা যদি প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে, তবে আইনশৃঙ্খলার কোথাও ফাঁক আছে তা স্পষ্ট।”
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ছাত্ররাজনীতি ও প্রশাসনিক তৎপরতার সম্পর্ক। দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহে ছাত্রলীগের কিছু অংশ নানা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িত ছিল। সংগঠনটি নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও তাদের অনেকেই সামাজিকভাবে সক্রিয় ছিল বলে জানা গেছে। অনেকে মনে করছেন, এই মিছিল তাদের একটি “পুনরুত্থানের ঘোষণা।”
দিনের শেষ দিকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি টহল বাড়ানো হয়। দীঘারকান্দা বাইপাস এলাকার দোকানপাটে স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরলেও মানুষের আলোচনায় এখনো রয়ে গেছে সেই দুই মিনিটের মিছিল।
ময়মনসিংহের সাধারণ মানুষ এখন প্রশ্ন করছেন—নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা যদি প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে, তাহলে নিষেধাজ্ঞার অর্থ কোথায়? শহরজুড়ে এখন কৌতূহল আর আতঙ্ক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে রাজনৈতিক প্রতীকী প্রদর্শন, অন্যদিকে প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ—দুইয়ের সংঘাতে ময়মনসিংহ যেন আবারও রাজনীতির উত্তাপে জর্জরিত হয়ে উঠছে।
এই ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে হয়তো একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে—‘ছাত্রলীগ এখনো নিস্তেজ নয়।’ কিন্তু সেই বার্তার প্রতিধ্বনি এখন ময়মনসিংহের গলিপথে, চায়ের দোকানে, অফিসে—সবখানেই শোনা যাচ্ছে এক প্রশ্নে, আইন কি কেবল কাগজে-কলমে, নাকি বাস্তবেও কার্যকর?