প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মোংলার সুন্দরবনে ঘুরতে গিয়ে জালিবোট ডুবে নিখোঁজ হওয়া নারী পর্যটক রিয়ানা আফজালের মরদেহ উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর দীর্ঘ অভিযান শেষে সোমবার (১০ নভেম্বর) তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ৮ নভেম্বর ১৩ জন পর্যটক সুন্দরবনে ভ্রমণের জন্য ঢাকার উত্তরা থেকে যাত্রা শুরু করেন। তারা প্রথমে দাকোপ উপজেলার রেখামারী এলাকায় একটি রিসোর্টে রাত্রীযাপন করেন। পরের দিন, ৯ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জালিবোটে মোংলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়। বোটটি দুপুর ১টার দিকে সুন্দরবনের ঢাংমারি খাল সংলগ্ন পশুর নদীর ত্রিমোহনায় পৌঁছালে প্রবল ঢেউয়ের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়।
স্থানীয়দের সহায়তায় ১২ জন পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও রিয়ানা আফজালকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে বোটে থাকা এক ব্যক্তি দুর্ঘটনার বিষয়টি কোস্টগার্ডকে জানান। এরপর কোস্টগার্ড, স্থানীয় উদ্ধারকর্মী ও নৌসেনার যৌথ অভিযানে নিখোঁজ রিয়ানার সন্ধান শুরু হয়।
কোস্টগার্ড জানায়, দুর্ঘটনার পর দুইদিনের তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। নদী ও নিকটবর্তী জলস্রোত, খাল এবং তীরে নিয়মিত নজরদারি ও ডুবুরি দলসহ উদ্ধারকর্মীদের মাধ্যমে রিয়ানা আফজালের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। অবশেষে ৪৮ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
উদ্ধারকালে কোস্টগার্ড কর্মকর্তা বলেন, “দূর্ঘটনা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে, উদ্ধার অভিযান জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। নদীর প্রবল ঢেউ ও ঘন কুয়াশার কারণে কার্যক্রমে দেরি হয়েছে। তবে কোস্টগার্ডের দ্রুত ও পেশাদার উদ্যোগের কারণে মরদেহ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।”
স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকবৃন্দ রিয়ানার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, এই দুর্ঘটনার পর সুন্দরবনে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও বোট ভ্রমণের নিয়মাবলী আরও কঠোর করার বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। কোস্টগার্ড বলছে, নদী ও খালের ভ্রমণে পর্যটকদের জন্য লাইফজ্যাকেট পরিধান, অনুমোদিত বোট ব্যবহার এবং স্থানীয় সতর্কতা মেনে চলা আবশ্যক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুন্দরবনের নদ-খাল ও জলপথে ভ্রমণ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। আবহাওয়ার পরিবর্তন, নদীর ঢেউ এবং অপ্রশিক্ষিত নাবিক বা ছোট বোট ব্যবহার দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হতে পারে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও প্রশিক্ষিত নাবিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।
রিয়ানা আফজালের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে স্বাভাবিক ও নিরাপদ পর্যটন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও কোস্টগার্ড পর্যটকদের সচেতন করার পাশাপাশি উদ্ধার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে আরও উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত রয়েছে।
এই দুর্ঘটনার পর কোস্টগার্ডের বরাত দিয়ে বলা হয়, নদী ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা এবং সব সময় লাইফজ্যাকেট ব্যবহার অপরিহার্য। পর্যটকরা যেন কখনো অনুমোদনবিহীন ছোট নৌকা বা বিপজ্জনক এলাকায় ভ্রমণ না করেন, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখা হবে।
সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক এবং পর্যটন এলাকা। নদী, খাল ও বনাঞ্চলের মধ্যে সুরক্ষিত ভ্রমণ নিশ্চিত করা না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ক্রমবর্ধমান। স্থানীয় প্রশাসন ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে নিয়মিত সচেতনতা বৃদ্ধি, ভ্রমণ বিধি প্রণয়ন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি অব্যাহত রাখবে।
রিয়ানা আফজালের মৃত্যুতে পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা আর কেউ যেন না ভোগে এবং পর্যটকরা নিরাপদে সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারেন। কোস্টগার্ডও জানাচ্ছে, ভবিষ্যতে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এই দুর্ঘটনা সুন্দরবনে পর্যটন নিরাপত্তার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। স্থানীয় প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও বনবিভাগের যৌথ প্রচেষ্টা ছাড়া ভ্রমণ নিরাপদ করা কঠিন। তবে রিয়ানা আফজালের উদ্ধারের ঘটনায় দেখা গেছে, পেশাদার উদ্ধার দল সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
সুন্দরবনের নদ-নদী ও খালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যটক সচেতনতা, লাইফজ্যাকেট ব্যবহার ও অনুমোদিত নৌকা ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।