ভাষণের আগে উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন ড. ইউনূস

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
হাদির ওপর হামলা তদন্তে কঠোর নির্দেশ দিলেন প্রধান উপদেষ্টা

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আসন্ন সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে নজর এখন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের দিকে। বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার নির্ধারিত ভাষণকে ঘিরে রাজধানীসহ সারাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে প্রবল আগ্রহ ও জল্পনা-কল্পনা। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, দুপুরে এই ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বিটিভি নিউজ এবং বিটিভি ওয়ার্ল্ড।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ড. ইউনূস তার ভাষণে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও সম্ভাব্য গণভোটের বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে পারেন। তবে ভাষণটি হবে সংক্ষিপ্ত এবং সরাসরি সম্প্রচারিত। সাধারণত জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ আগে থেকে রেকর্ড করা হয়, কিন্তু এবার প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ভাষণ সম্প্রচারের আগে বৃহস্পতিবার সকালেই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠক, যেখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং চলমান রাজনৈতিক সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। জানা গেছে, সেই বৈঠকেই মূলত ভাষণের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। বিএনপি এবং তাদের সমমনা জোট এই আদেশের তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের দাবি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত সংসদের মাধ্যমেই হতে হবে, প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে নয়। বিএনপি নেতারা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টার এমন কোনো অধ্যাদেশ জারি করার আইনগত ক্ষমতা নেই, এবং যদি কোনো বিশেষ আদেশ জারি করতেই হয়, তা রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে হতে হবে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল কনসারভেটিভ পার্টি (এনসিপি) এবং কিছু ইসলামপন্থী দল জুলাই সনদের বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, এই আদেশ দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য গঠনের জন্য জরুরি। তারা চান, প্রধান উপদেষ্টা তার বিশেষ ক্ষমতাবলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিন এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কারের একটি স্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করুন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা গড়ে তোলার জন্য উপদেষ্টা পরিষদ গত ৩ নভেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহ সময় দিয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হলেও এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দলগুলো। বিএনপি জানিয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা নয়, তারা কেবল সরকারের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে আলোচনায় অংশ নেবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পক্ষ থেকে বিএনপিসহ অন্যান্য দলকে আলোচনায় অংশ নিতে আহ্বান জানানো হলেও, তা ব্যর্থ হয়েছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত মাসের শেষদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ করে একটি বিস্তারিত প্রস্তাবনা পেশ করে। ঐ প্রস্তাবনাতেই বলা হয়েছিল, নতুন সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে একটি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত নেওয়া হবে। বিএনপিসহ কয়েকটি দল ঐ প্রস্তাবের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আপত্তি তোলে। বিশেষ করে গণভোটের সময় নির্ধারণ, সনদে উল্লিখিত কিছু সাংবিধানিক ধারা এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে তাদের অসন্তোষ রয়েছে।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা চাইছে, জুলাই সনদের আলোকে নতুন নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন দ্রুত বাস্তবায়িত হোক। এনসিপিও কিছু ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে, বিশেষ করে গণভোটের আগে সনদের কয়েকটি ধারার ব্যাখ্যা স্পষ্ট করার বিষয়ে।

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এসব বিষয় নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা গত এক সপ্তাহ ধরে একাধিক বৈঠক করেছেন। তারা আইনি বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নিয়েছেন। এমনকি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতিসহ একাধিক সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করেছেন উপদেষ্টারা।

ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয় ছিল — জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশাসনিক কাঠামো, গণভোটের সময়সূচি এবং নির্বাচনী রোডম্যাপ। বৈঠকে উপস্থিত এক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণটি হবে “নীতিগত ঘোষণা” ধাঁচের, যেখানে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে জানাবেন, সরকার জুলাই সনদের কোন ধারাগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে এবং কোনগুলো নিয়ে পরবর্তী পর্যালোচনা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একদিকে যেখানে বিএনপি ও তাদের জোট সংবিধানভিত্তিক প্রক্রিয়ায় ফেরার দাবি তুলছে, সেখানে অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির মতো দলগুলো সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার আদেশের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি গঠনের আহ্বান জানাচ্ছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও ড. ইউনূসের এই ভাষণকে ঘিরে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রধান উপদেষ্টার এই ঘোষণার ওপর। দেশজুড়ে গণভোটের সম্ভাবনা, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, এবং নতুন নির্বাচনী রোডম্যাপ — সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের ভাষণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরাতে পারে বলে তারা মনে করছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সচেতন নাগরিকদের মধ্যেও চলছে নানা আলোচন-সমালোচনা। কেউ কেউ আশা করছেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হবে, আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে জাতির দৃষ্টি এখন প্রধান উপদেষ্টার দিকে। বৃহস্পতিবার দুপুরের সেই ভাষণেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে — গণভোট ও রাজনৈতিক সংস্কারের পথে, না কি পুরনো দ্বন্দ্ব ও মতভেদের ঘূর্ণিতে ফের ঘুরপাক খাবে দেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত