প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আইএফআইসি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও প্রধান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা ইকবাল পারভেজ চৌধুরী ব্যাংকের চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে ব্যবসায় জড়িত ছিলেন—এমন অভিযোগ উঠে বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে। তিনি ‘ইকবাল ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানটির নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চকবাজার শাখায় একটি হিসাব খোলা হয়েছিল, যেখানে প্রায় ৯ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইকবাল পারভেজ চৌধুরী ব্যাংকের সার্ভিস রুলের ৯ ও ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। ব্যাংকের চাকরিবিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার অফিসিয়াল দায়িত্বের বাইরে নিজের নামে বা অন্যের প্রতিনিধি হিসেবে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন না। অনুমোদন ছাড়া খণ্ডকালীন কাজ বা অন্য কোনো ব্যবসা করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ব্যাংকের অনুমোদন নিলেও ডিএমডি কোনো অনুমোদন নেননি।
তদন্তে জানা যায়, ২০২৩ সালে একটি এসএমই বা ব্যবসায়িক ঋণ পাওয়ার উদ্দেশ্যে ইকবাল পারভেজ চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ‘মেসার্স ইকবাল ট্রেডার্স’ নামে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করেন। এরপর প্রতিষ্ঠানটির নামে ইউসিবি ব্যাংকের চকবাজার শাখায় হিসাব খোলা হয়। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন করা হয়।
অস্বাভাবিক লেনদেন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত থাকার বিষয়টি ইকবাল পারভেজ চৌধুরী নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি বিএফআইইউকে জানিয়েছেন, এসএমই ঋণ পাওয়ার শর্ত অনুযায়ী অ্যাকাউন্টে ভালো লেনদেন থাকা প্রয়োজন ছিল। এজন্য তার পরিচিত এক ব্যবসায়ী ওই অ্যাকাউন্টে কিছু লেনদেন পরিচালনা করেছিলেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন যে বিষয়টি তার চাকরির নিয়মের পরিপন্থী। এরপর তিনি অ্যাকাউন্টের সব লেনদেন বন্ধ করে ব্যাংককে ঋণ না দেওয়ার অনুরোধ করেন।
অস্বাভাবিক হলেও, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মনসুর মোস্তফা ডিএমডি ইকবাল পারভেজ চৌধুরীর এই কাজকে প্রশংসাপত্রের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। বিএফআইইউর অনুসন্ধানের পরও এমডির এই পদক্ষেপ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিএফআইইউ জানিয়েছে, ব্যাখ্যা বিবেচনার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সহানুভূতি বিবেচনায় আনা হয়নি।
আইএফআইসি ব্যাংকের ডিএমডি ও মুখপাত্র রফিকুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে বোর্ড থেকে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান, তবে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কাউকে এ কাজে রাখা হয়নি।”
সংস্থার চাকরিবিধি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, কর্মকর্তারা কোনো অফিসিয়াল দায়িত্ব ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসা, চাকরি বা কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন না। এমন নিয়মের লক্ষ্য ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইকবাল পারভেজ চৌধুরীর কর্মকাণ্ড এই বিধান লঙ্ঘন করেছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।
আইএফআইসি ব্যাংকের এই বিতর্ক আগামী দিনগুলোতে নজরকাড়া ইস্যু হিসেবে উদ্ভূত হতে পারে। ব্যাংকিং খাতের নিয়ম ও কর্মকর্তাদের নৈতিক দায়িত্বের ওপরও এ ধরনের ঘটনা প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন ঘটনায় ব্যাংকের প্রতিপত্তি ও গ্রাহক বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তদন্তের স্বচ্ছতা ও সময়মতো ফলাফল এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের ডিএমডি ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো ব্যাংকের মান ও নীতি অনুসরণ নিশ্চিত করা। এই ঘটনা ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও নজর কাড়তে পারে।
এদিকে, সার্বিক বিষয়ে জানতে ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডিকে ফোন করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। পরে মেসেজ পাঠালেও কোন সাড়া মেলেনি। তবে ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা নেওয়া হচ্ছে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে সরকারি নির্দেশিকা, ব্যাংকের নীতি ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। ইকবাল পারভেজ চৌধুরীর ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, ব্যাংকিং পেশায় উচ্চপদে থাকা কর্মকর্তারাও নীতিমালা লঙ্ঘন করতে পারেন। এই বিষয়টি ভবিষ্যতে অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।
তদন্তের ফলাফল, ব্যাংকের পদক্ষেপ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিক্রিয়া আগামী দিনে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে নতুন দিক নির্দেশ করতে পারে। ইকবাল পারভেজ চৌধুরীর ব্যাখ্যা ও ব্যবস্থাপনা স্তরের প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘটনা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হিসেবে রূপ নিয়েছে।










