বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিন বড় চ্যালেঞ্জ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৬ বার
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিন বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও এখনো তিনটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে। দুর্বল রাজস্ব সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং খাত এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি—এই চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) বিশেষভাবে সতর্ক করে দিয়েছে।

ঢাকা সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদল, যা ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির পঞ্চম পর্যালোচনার জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে, তাদের বিবৃতিতে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্রিস পাপাজর্জিও। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হলেও, দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক কাঠামোর দুর্বলতা শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাজারের ঝুঁকির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামো এখনও শক্তিশালী নয়। কর সংগ্রহের প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল, ফলে সরকার পর্যাপ্ত রাজস্ব আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে। রাজস্ব ঘাটতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং এটি অন্য আর্থিক সূচকগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকিং খাতের মূলধনের ঘাটতি এবং কার্যকর আর্থিক তদারকি না থাকাও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সংস্থার বিশেষজ্ঞরা আরও মন্তব্য করেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাফল্য পাওয়া গেলেও এটি এখনো উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে দুই অঙ্কের নিচে নেমে আসা মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৮ শতাংশে স্থিতিশীল হয়েছে। যদিও এই হ্রাস সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর নীতি গ্রহণ প্রয়োজন।

আইএমএফের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন সাহসী এবং সমন্বিত নীতি। রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার, কর সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ করা, এবং আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করব্যবস্থা গড়ে তোলাই সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।

বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি অর্থবছর ২০২৪–২৫-এ দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, উৎপাদনে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠা-নামার প্রভাব এই প্রবৃদ্ধি হ্রাসে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বিনিয়োগ প্রণোদনা বাড়ানো, যুব বেকারত্ব কমানো এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

আইএমএফ আশাবাদী, যদি কর সংস্কার এবং আর্থিক খাতের পুনর্গঠন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ২০২৫–২৬ ও ২০২৬–২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে প্রবৃদ্ধি সামান্য কমে সাড়ে ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকারের নীতি নির্ধারণে দৃঢ়তা এবং সক্রিয় বাস্তবায়ন।

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়, সামাজিক ও প্রশাসনিক সংস্কারও জরুরি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্নীতি হ্রাস এবং যুব সমাজের কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিলে প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই হবে। সংস্থার মতে, দেশের অর্থনীতির জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে না পারলে দেশের আর্থিক কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

আইএমএফ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, সরকারের উচিত একটি সমন্বিত কর সংস্কার এবং আর্থিক খাত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করা। সংস্থার বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরণের পদক্ষেপ দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণ, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ঋণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং স্থিতিশীল দেশ হিসেবে তুলে ধরতে এটি সহায়ক হবে।

বিবৃতিতে আইএমএফ আশা প্রকাশ করেছে, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের শক্তিশালী পুনর্গঠন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে, দেশের উন্নয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। এছাড়া মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে নতুন শিল্প, প্রযুক্তি এবং কৃষি খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোও গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, নীতি গ্রহণে দেরি করা এবং ক্ষুদ্র সংস্কারেই সন্তুষ্ট না হয়ে, মূল কাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান আর্থিক অবস্থার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত এবং দৃঢ় নীতি। রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করতে গেলে সরকারের দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ঋণ তহবিলের সুবিধা কাজে লাগাতে স্বচ্ছতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এই বিবৃতির প্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজ আইএমএফের উদ্বেগকে গুরুত্বসহকারে দেখছে। তারা মনে করছে, সরকারের কর সংস্কার, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হলে দেশের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ী উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির জন্য এখন সময় উপযোগী ও সাহসী নীতি গ্রহণের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত