প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামী বছরের হজকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর নতুন নির্দেশনা জারি করেছে সৌদি আরব। বিশেষ করে শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত বা দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য হজ অংশগ্রহণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। হজ একটি শারীরিক পরিশ্রমসাপেক্ষ ইবাদত হওয়ায়, হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
সোমবার প্রকাশিত দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যানসার, গুরুতর কিডনি রোগ, হার্টের জটিল সমস্যা, উন্নত পর্যায়ের ফুসফুস বা লিভার রোগ, গুরুতর মানসিক ব্যাধি কিংবা অন্য কোনো জটিল শারীরিক সমস্যায় ভোগেন এমন ব্যক্তিরা আগামী বছর হজে অংশ নিতে পারবেন না। সৌদি সরকার জানিয়েছে, এসব গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি হজের কষ্টকর শারীরিক পরিবেশ, তাপমাত্রা এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা ইবাদতের ধকল সামলাতে অক্ষম হন—ফলে তাদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
মক্কা ও মিনার তীব্র গরম, দীর্ঘ দূরত্ব হাঁটা, ভিড়ের মধ্যে অবস্থান, নির্দিষ্ট সময় অনুসরণ করে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালন—এসবই শারীরিকভাবে দুর্বল কারও জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, অনেক হাজি শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে সৌদিতে গিয়ে সংকটে পড়েন; কারও অবস্থা এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, হজ শেষ করার আগেই তাদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় বা নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হয়।
নতুন নীতিমালায় সৌদি আরব সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছে, যেসব হজযাত্রী হজের জন্য অনুপযুক্ত অবস্থায় সৌদিতে পৌঁছাবেন, তাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। আর সেই ফেরত পাঠানোর সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করতে হবে সংশ্লিষ্ট যাত্রীকেই। নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ মনে করে, এতে একদিকে অসুস্থ ব্যক্তির ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে হজ ব্যবস্থাপনাও আরও সুশৃঙ্খল হবে।
সৌদি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেরিত হজযাত্রীদের শারীরিক যোগ্যতা যাচাইয়ে এবার আরও কড়াকড়ি করা হবে। প্রতিটি দেশের চিকিৎসকের দেওয়া ফিটনেস সার্টিফিকেট সৌদি মনিটরিং টিম আলাদাভাবে পরীক্ষা করবে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে—কেউ যেন অসুস্থতার তথ্য গোপন করে বা ভুল ফিটনেস সার্টিফিকেট নিয়ে হজে অংশ না নেন। মন্ত্রণালয় স্পষ্ট সতর্ক করে দিয়েছে, ফিটনেস সার্টিফিকেটে অনিয়ম বা ভুল তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এতে কেবল রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, হজ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, মেডিকেল টিম ও হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। তাই এ বছর থেকেই কঠোর মূল্যায়ন এবং যাচাই-বাছাই অপরিহার্য করা হয়েছে।
কিডনি রোগীরা, বিশেষ করে যারা নিয়মিত ডায়ালাইসিস নেন—তারা হজের সময় গুরুতর সংকটে পড়তে পারেন, কারণ মক্কা-মিনায় ওই পর্যায়ের নিয়মিত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সবসময় সহজ নয়। দীর্ঘ দূরত্ব হাঁটা কিংবা উচ্চ তাপমাত্রা তাদের শরীরে অতিরিক্ত চাপ ফেলে। হৃদরোগীদের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি রয়েছে। হার্টের রক্তনালী সংকুচিত হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ বা কার্ডিয়াক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য হজের পরিবেশ—বিশেষ করে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটা—জীবনহানির আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে।
গুরুতর স্নায়ুবিক সমস্যা, স্মৃতিভ্রংশ, ডিমেনশিয়া বা গুরুতর প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বিপুল। হজের প্রতিটি ধাপ অনুসরণে যে মনোযোগ ও নিয়মতান্ত্রিকতা দরকার, তা এসব সমস্যায় ভোগা মানুষের পক্ষে পালন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে তারা নিজেরা যেমন ঝুঁকিতে থাকেন, তেমনি অন্য হাজিদের জন্যও পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারেন।
বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের কাছে হজ একটি গভীর আবেগের স্থান। অনেকেই সারাজীবন সঞ্চয় করে একবার হজ করতে চান। বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে হজে অংশ নেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা বেড়ে যায়। তাই এ ধরনের বিধিনিষেধ প্রায়ই আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও সৌদি আরব মনে করছে—জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশেও এ নির্দেশনার প্রভাব পড়বে উল্লেখযোগ্যভাবে। প্রতি বছর দেশের বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি চিকিৎসাজনিত জটিলতা নিয়ে হজে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নতুন নীতিমালার ফলে এখন থেকে হজ এজেন্সি, চিকিৎসক ও সরকারি কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে এসব বিষয় যাচাই করতে হবে। সরকারের হজ ব্যবস্থাপনা বিভাগ ইতোমধ্যে নির্দেশনার আলোকে প্রস্তুতি শুরু করেছে। যেখানে চিকিৎসকের ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়াও প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত নিতে হতে পারে।
বাংলাদেশি হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও নতুন মানদণ্ড অনুসরণে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। হজযাত্রীদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই আরও কড়াকড়ি হবে, যাতে কেউ অসুস্থতা গোপন করে যাত্রা না করেন। কারণ এতে শুধু তার নিজের জীবনই বিপন্ন হয় না, বরং সৌদিতে গেলে সংকট তৈরি হয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায়ও।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হজের সময় অত্যধিক রোগী চাপ সৌদির হাসপাতালগুলোকে অতিরিক্ত ভারে ফেলছে। অনেকেই প্রচণ্ড গরম, পানিশূন্যতা, হার্ট অ্যাটাক বা শ্বাসকষ্টে ভুগে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। ফলে সৌদি সরকার এই বাস্তবতা বিবেচনা করেই এ বছর নতুন নীতি ঘোষণা করেছে।
সৌদির স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর আগে জানিয়েছিল, গত কয়েক বছর হজ মৌসুমে বৃদ্ধ বা অসুস্থ হাজিদের মৃত্যু তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। এসব মৃত্যু প্রতিরোধে নতুন নীতিমালার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছে দেশটির চিকিৎসাবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটি।
হজের মতো পবিত্র ইবাদত সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে শারীরিক সক্ষমতা অপরিহার্য—এই বার্তা দিয়েই সৌদি সরকারের নতুন নির্দেশনা কার্যকর হতে যাচ্ছে। এতে অনেকের জন্য হজে যাওয়ার পথ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও বৃহত্তর স্বার্থে এটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভবিষ্যতে চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হলে হয়তো শারীরিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে বর্তমান বাস্তবতায়, হজের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সৌদি সরকারের এই কঠোর নীতিমালা আগামী হজ মৌসুমে গভীর প্রভাব ফেলবে—এটা নিশ্চিত।