প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট, কাঠামোগত দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব, সেবার বৈষম্য ও মানবসম্পদের সীমাবদ্ধতার মতো সমস্যায় জর্জরিত একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দেশব্যাপী আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন সরকারকে যে বিস্তৃত প্রস্তাব জমা দিয়েছে, তা যেন পুরো ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর একটি বড় নীলনকশা। এই নীলনকশার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই, জবাবদিহিমূলক ও সেবাভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে।
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন নামের একটি স্বতন্ত্র সংস্থা গঠন, যা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য সেবার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ সমাধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। কমিশনকে একেবারে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বে একটি অবস্থান দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে তার কার্যক্রমে কোনো আমলাতান্ত্রিক বাধা বা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা প্রভাব ফেলতে না পারে। এ কারণে কমিশন সরাসরি জবাবদিহি করবে কেবল সরকারপ্রধানের কাছে।
কমিশনের আনিত সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক কাঠামোতে যুগান্তকারী পরিবর্তন। বর্তমান স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ভেঙে একটি নতুন কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে, যার অধীনে থাকবে একজন চিফ সেক্রেটারি এবং তিনটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর। কমিশনের যুক্তি হলো— স্বাস্থ্য খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সেবা প্রদান, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে একই কাঠামোর মধ্যে রেখে কার্যকর সংস্কার করা সম্ভব নয়। এজন্য বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেবার মান উন্নয়নের জন্য মন্ত্রণালয়ের সর্বস্তরে আর্থিক ও জনবল সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে কমিশন।
এই সংস্কার নীতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্যাদা, দক্ষতা ও পেশাগত অগ্রগতিকে নতুন আলোচনায় আনা। চিকিৎসকদের মেধা ও দীর্ঘ শিক্ষাকাল বিবেচনায় নিয়ে প্রারম্ভিক পদ জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিবের সমান করার সুপারিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। একই সঙ্গে নার্সিং ও প্যারামেডিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি এবং শিক্ষকদের কেবলমাত্র শিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত রাখার প্রস্তাব বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের শ্রেণিকক্ষে সম্পৃক্ত রাখাও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জনস্বাস্থ্য খাতকে আলাদা ও শক্তিশালী করার বিষয়ে কমিশনের সুপারিশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ জনস্বাস্থ্য কেবল রোগের চিকিৎসা নয়, বরং রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি, পারিবারিক স্বাস্থ্য, সামাজিক সুস্থতা এবং মহামারি ব্যবস্থাপনার মতো বহুবিধ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে। কমিশন বলেছে, পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত দেশেই জনস্বাস্থ্যের জন্য পৃথক কাঠামো রয়েছে, এমনকি প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে। অথচ বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম এখনো হাসপাতালমুখী সেবার সঙ্গে জটিলভাবে মিশে আছে। এই অবস্থায় জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠন করা হলে মহামারি বা দুর্যোগের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সব প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি ব্যবহারের ক্ষমতা প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একীভূত করার প্রস্তাবও একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা ও কর্মী সংকটের কারণে কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এই অধিদপ্তরের কর্মীদের বয়স, সক্ষমতা এবং কাজের ধরন বিবেচনায় এনে তাদের নতুনভাবে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করার কথা বলা হয়েছে। তাদেরকে ঘরে ঘরে গিয়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সেবা, পুষ্টি, ওষুধ ব্যবস্থাপনা এবং পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে জনস্বাস্থ্যের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে যুক্ত করার পরিকল্পনা অত্যন্ত মানবিক ও কার্যকর হতে পারে।
হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবা বিভাগের নতুন কাঠামো সম্পর্কেও বিস্তৃত সুপারিশ এসেছে। হাসপাতাল-ভিত্তিক সেবা প্রদানকারীদের পাশাপাশি নার্স ও প্যারামেডিকদের একীভূত করা হলে সেবার দক্ষতা ও সমন্বয় বাড়বে। একই সঙ্গে পরীক্ষাগার, ফার্মাসি, রক্ত পরিসঞ্চালন ও অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে আরও শক্তিশালী করতে আলাদা পরিচালন কাঠামো তৈরির প্রস্তাব এসেছে, যাতে দেশের সব হাসপাতালেই এসব অত্যাবশ্যক সেবা ২৪ ঘণ্টা প্রাপ্য থাকে।
স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। কমিশন এই খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছে, যা বর্তমান বরাদ্দের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ রাখার দাবি করেছে কমিশন। অর্থসংস্থানের জন্য সিন-ট্যাক্স, দাতা সংস্থা, রোগী বা প্রতিষ্ঠানিক দানের পাশাপাশি সংগঠিত খাতের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবীমা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে দেশের ২০ শতাংশ অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হাসপাতালে সেবা দেওয়ার নীতি বহাল রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই সংস্কারের অন্যতম শক্তিশালী অংশ হলো এলাকাভিত্তিক সেবাবণ্টন ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা দূর করা। কমিশন বলেছে, প্রতিটি এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী কোন হাসপাতালে কোন সেবা পাবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনাসহ একটি জাতীয় মানচিত্র তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি দশ বছর অন্তর উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য জরিপ পরিচালনা করে সেবার প্রকৃতি নির্ধারণ প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি স্বাধীন কর্ম কমিশন গঠনের প্রস্তাব ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। কারণ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, পক্ষপাত এবং অযোগ্যতার অভিযোগ বহু পুরনো।
স্বাস্থ্য কমিশনের এই বিস্তৃত প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করা নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। তবে বাংলাদেশ যদি একটি আধুনিক, টেকসই, জবাবদিহিমূলক এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে, তবে এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশের প্রতিটি মানুষ আরও উন্নত, আরও মানবিক এবং আরও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকারী হবে—এমনই প্রত্যাশা দেশের স্বাস্থ্যসচেতন নাগরিকদের।