প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নিউ ইয়র্কের সথেবিজ় নিলামে সম্প্রতি এক অদ্ভুত এবং আলোড়ন সৃষ্টি করা শিল্পকর্ম বিক্রি হয়েছে। ১৮ ক্যারেট খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি, ১০১ কেজি ওজনের সম্পূর্ণ কার্যকরী একটি টয়লেট, যার শিরোনাম ‘আমেরিকা’, ১.২১ কোটি টাকায় (১২.১ মিলিয়ন ডলার) বিক্রি হয়েছে। ইতালির প্রখ্যাত সমকালীন শিল্পী মৌরিজিও ক্যাটেলান এটি তৈরি করেন। এই শিল্পকর্ম মূলত অতিধনীদের জীবনধারাকে ব্যঙ্গ করার উদ্দেশ্যে নির্মিত।
২০১৬ সালে সৃষ্ট এ সোনার টয়লেটটির নিলাম শুরু হয়েছিল ১০ মিলিয়ন ডলার থেকে। ক্যাটেলান নিজের ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে। তিনি বলেছেন, ধনী বা গরিব, যে-ই ব্যবহার করুক না কেন, টয়লেট ব্যবহারের পরিণতি সবার জন্য একই। এটি একটি তীক্ষ্ণ সামাজিক মন্তব্য, যা ধনী ও প্রভাবশালী মানুষদের জীবনধারার ফাঁকফোকরকে তুলে ধরেছে। নিলাম সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি শিল্প উৎপাদন ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যের সংঘর্ষের একটি প্রতিফলন।
নিলামের রাতে শুধু এই টয়লেট নয়, অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্মও বিক্রি হয়। আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে এই নিলামে নতুন রেকর্ডও গড়া হয়। গুস্তাভ ক্লিম্টের ‘পোর্ট্রেট অব এলিজাবেথ লেডারার’ বিক্রি হয় ২৩৬ মিলিয়ন ডলারে, যা সথেবিজ়ের ইতিহাসে সর্বকালের সবচেয়ে দামি শিল্পকর্ম হিসেবে রেকর্ড করা হয়। ক্লিম্টের অল্প কিছু চিত্রকর্মই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে অক্ষত অবস্থায় রক্ষা পেয়েছে, যার মধ্যে এটি অন্যতম। এই পোর্ট্রেটটি ছিল এস্টি লওডারের উত্তরাধিকারী বিলিয়নিয়ার লিওনার্ড এ. লওডারের সংগ্রহে।
‘আমেরিকা’ সোনার টয়লেটের দুটি সংস্করণ তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি নিউ ইয়র্কের গুগেনহাইম মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয়েছিল। তখন মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এটিকে ধার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প তখন ভ্যান গগের ছবি ধার চেয়েছিলেন। আরেকটি সংস্করণ প্রদর্শিত হয়েছিল যুক্তরাজ্যের ব্লেনহাইম প্যালেসে, যা উইনস্টন চার্চিলের জন্মস্থান। ওই সংস্করণটি চুরির শিকার হয়। চুরির ঘটনায় দুই ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হন, তবে সেই টয়লেটের অবস্থান এখনও অজানা। ধারণা করা হয়, এটি ভেঙে গলিয়ে ফেলা হয়েছে।
নিলামের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ‘আমেরিকা’ সথেবিজ়ের নিউ ইয়র্ক সদর দফতরে প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রদর্শনীর সময় ক্রেতারা এটি ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করেন। শিল্পকর্মটি শুধু সোনার কারণে নয়, বরং এর ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক বার্তা এবং ব্যবহারযোগ্য প্রকৃতির কারণে সমালোচক ও দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটি শিল্প ও ধন-বৈষম্যের মধ্যে একটি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তোলার চেষ্টা, যা আধুনিক শিল্পের এক বিশেষ দিককে প্রতিফলিত করে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্যাটেলানের ‘আমেরিকা’ একটি যুগান্তকারী শিল্পকর্ম। এটি শুধুমাত্র শিল্পের মূল্য নয়, বরং সমাজ ও অর্থনীতির ওপর প্রতিক্রিয়ার এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা। শিল্পকর্মটি দেখিয়ে দেয়, ধনসম্পদ এবং সামাজিক মর্যাদার চূড়ান্ত সমতা টয়লেট ব্যবহারের সময় সমান হয়ে যায়। এই ধারণাটি একটি গভীর দর্শন এবং সামাজিক ব্যঙ্গের মিশ্রণ, যা দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এই নিলামে আরও প্রকাশিত হয়েছে যে, সমসাময়িক শিল্প বাজারে চাহিদা এবং মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা অপ্রত্যাশিত এবং চমকপ্রদ হতে পারে। এমন একটি অদ্ভুত শিল্পকর্মের জন্য কোটি কোটি টাকার দর প্রদান, আধুনিক শিল্পের বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এবং সমালোচনার মধ্যে একটি বিস্ময়কর দিক তুলে ধরে।
সংক্ষেপে, ‘আমেরিকা’ শুধু একটি সোনার টয়লেট নয়। এটি একটি সামাজিক বার্তা, যা আধুনিক শিল্প, অর্থনীতি, ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জীবনধারা, এবং দর্শকদের মূল্যবোধকে ব্যঙ্গ করে। সথেবিজ় নিলামে এর বিক্রয় প্রমাণ করেছে যে, শিল্পকর্মের ব্যঙ্গাত্মক বার্তা এবং মূল্য একসাথে থাকলেও বাজারে তার চাহিদা অদ্ভুতভাবে উচ্চ হতে পারে। এই সোনার টয়লেট আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে একটি চিরস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে, যা দর্শক ও সমালোচকদের মনে দীর্ঘদিন আলোড়ন সৃষ্টি করবে।