ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুতের দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২ বার
ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুতের দাবি

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যখন উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই স্বস্তির বার্তা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি দাবি করেছেন, দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সর্বোচ্চ পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে, যা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে একটি শক্ত অবস্থানে রেখেছে।

শুক্রবার চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তার বক্তব্যে উঠে আসে সরকারের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্রকে তুলে ধরে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এপ্রিল ও মে মাসের জন্য দেশের জ্বালানি মজুত সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত রয়েছে। পাশাপাশি জুন মাসের সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় রেখে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে, যাতে দেশের কোথাও জ্বালানির ঘাটতি না হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে।”

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত পরিস্থিতি জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ইরানে হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থির হয়ে ওঠে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলেও চাপ তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। বাজারে হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়, যার প্রতিফলন দেখা যায় দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের মাধ্যমে।

পেট্রলপাম্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে অকটেন ও পেট্রলের ওপর। মার্চের শুরুতে এই দুই ধরনের জ্বালানির বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকারকে কিছু সময়ের জন্য রেশনিং ব্যবস্থাও চালু করতে হয়। যদিও পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে সেই রেশনিং তুলে নেওয়া হয়, তবে সরবরাহ এখনো নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী এর আগে জানিয়েছিলেন, দেশে বিদ্যমান মজুত দিয়ে অন্তত দুই মাস অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেল রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৫ টন, অকটেন রয়েছে ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রোল রয়েছে ১৮ হাজার ২১ টন এবং ফার্নেস ওয়েল রয়েছে ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন। এই পরিসংখ্যানই প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে আরও দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তার বক্তব্যে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানান, সরকার শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য এসব বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো একটি অঞ্চলে সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব বাংলাদেশে কম পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রীর মতে, দেশের শিল্প ও কৃষি খাতকে সচল রাখতে জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে দেওয়া যাবে না। তাই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও এই দুই খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা নিশ্চিত করতে চাই, কৃষি উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রম যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়।”

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকেই ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে সঠিক তথ্য ও স্বচ্ছ যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি, যাতে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক কমে এবং বাজার স্বাভাবিক থাকে।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রভাব যখন ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এই অবস্থান কিছুটা আশাব্যঞ্জক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করে দিচ্ছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সংকটের প্রভাব কম নয়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। ফলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর এই চাপ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এই আশ্বাস জনগণের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে শুধু মজুত বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং একটি টেকসই ও বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখোমুখি। এই পরীক্ষায় সফল হতে পারলে তা দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে কোনো ধরনের ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত