শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১১১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৩ বার
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১১১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের চিত্রশিল্প ও সংস্কৃতির অমর কীর্তিকর, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১১১তম জন্মবার্ষিকী আজ উদযাপিত হয়েছে। ১৯১৪ সালের এই দিনে ময়মনসিংহ জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করা জয়নুল আবেদিন সমগ্র জীবনই উৎসর্গ করেছিলেন বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের প্রসার, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দেশের মানুষের সংগ্রামকে চিত্রায়িত করতে। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাঙালি আধুনিক শিল্প আন্দোলনের পথিকৃৎ, যার প্রভাব আজও বাংলাদেশের চারুকলা ও সংস্কৃতিক অঙ্গনে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।

জয়নুল আবেদিনকে ‘শিল্পাচার্য’ খেতাব প্রদান করা হয়েছিল তার অক্লান্ত শ্রম, চিন্তাভাবনা ও শিক্ষাগত অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের মাধ্যমে তিনি আধুনিক চিত্রশিল্প শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশ চারুকলা ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নতুন দিকনির্দেশনা এবং সৃজনশীলতার প্রসারের জন্য তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিল্পের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে দিয়েছে।

জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ের স্কেচগুলো আন্তর্জাতিক খ্যাতির স্বীকৃতি পায়। এ দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, এবং জয়নুলের স্কেচগুলো সেই মানবিক বিপর্যয়কে অক্ষরে অক্ষরে, রেখায় রেখায় চিত্রায়িত করেছে। তিনি সস্তা প্যাকিং পেপার, চায়নিজ ইঙ্ক ও তুলির আঁচড় ব্যবহার করে “দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্র” সিরিজ তৈরি করেন, যা শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবিকতার অনন্য প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অন্যান্য বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে গ্রাম বাংলার উৎসবের চিত্রায়ণ করা ৬৫ ফুট দীর্ঘ ‘নবান্ন’ অন্যতম। এছাড়াও তার সৃষ্ট ‘মই টানা’, ‘গুন টানা’, ‘সাঁওতাল রমণী’, ‘সংগ্রাম’, ‘বিদ্রোহী’ প্রভৃতি চিত্রকর্মগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম এবং সাধারণ মানুষের জীবনধারার নিখুঁত প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত। তার এই শিল্পকর্মগুলো কেবল চিত্রকলার নিপুণ উদাহরণ নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজের গভীর অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরে।

আজ সোমবার সকাল ১১টায় তার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক বরেণ্য কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন)। চারুকলা বিভাগের পরিচালক আব্দুল হালিম চঞ্চলের নেতৃত্বে একাডেমির কর্মকর্তা, শিল্পী ও কর্মচারীগণ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিতরা নীরব শ্রদ্ধার মাধ্যমে শিল্পীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তাঁর শিল্প, জীবন ও আদর্শকে স্মরণ করেন।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্ম শুধু চিত্রকলার কৌশল নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। তিনি তাঁর শিল্পের মাধ্যমে যে মানবিক অনুভূতি, সংগ্রাম, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য তুলে ধরেছেন, তা আজও শিক্ষার্থী ও শিল্পপ্রেমীদের জন্য একটি শিক্ষা। তাঁর কাজ প্রমাণ করে যে শিল্পের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব, এবং চিত্রকলার শক্তি সমাজের জ্ঞান ও নৈতিকতার সাথে সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রশিল্প আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে জয়নুল আবেদিন কেবল একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সমাজ সচেতন চিত্রশিল্পী। তার কাজের মধ্যে সমকালীন সমাজের দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন চিত্রশিল্প শুধু আলঙ্কারিক হোক না, বরং মানুষের বাস্তব জীবন ও সংগ্রামের এক সত্যিকারের ছবি ফুটে উঠুক।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জীবন ও কাজ বাংলাদেশে আধুনিক চিত্রকলার ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর দর্শন, শিল্পকর্ম ও শিক্ষণ পদ্ধতি আজও বাংলাদেশের চিত্রশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে। জন্মবার্ষিকীর এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্ম ও শিক্ষণধারা দেশ ও সমাজের জন্য অনন্য উদাহরণ এবং তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত ও সমাদৃত হবে।

আজকের এই জন্মবার্ষিকী শুধু একটি অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জীবন, আদর্শ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের একটি বড় শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখা গেছে। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিল্পকলা একাডেমি, শিল্পী সমাজ এবং শিক্ষার্থীরা তাঁর শিল্প ও শিক্ষার ধারাকে সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মবার্ষিকী প্রতিটি শিল্পপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের কাছে একটি স্মরণস্মারক বার্তা: সমাজের দারিদ্র্য, দমন, শোষণ ও মানবিক দুর্বলতা চিত্রকলার মাধ্যমে তুলে ধরে মানবতাকে সামনে রাখা যায়। এই বার্তা আজও প্রাসঙ্গিক এবং তা শিল্প, সংস্কৃতি ও শিক্ষার জগতে নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত