ট্রাম্পের শুল্কারোপ বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
ট্রাম্পের শুল্কারোপ ও বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৫ সাল অর্থনীতিতে এক নতুন অস্থিরতার যুগকে সামনে এনেছে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই ট্রাম্প বিদেশী পণ্যের ওপর উচ্চমাত্রার শুল্কারোপ আরোপের মাধ্যমে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। এই শুল্কারোপ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়নি, বরং বিশ্ববাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।

ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির মূল ভিত্তি ছিল প্রতিটি দেশের আমদানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ শুল্ক আরোপ করে, ঠিক একই পরিমাণ শুল্ক সেই দেশের ওপর আরোপ করা। ১৩ ফেব্রুয়ারি এই নীতির ঘোষণা দেন তিনি। পরবর্তীতে ২ এপ্রিল বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের আমদানি পণ্যের ওপর দুই অঙ্কের শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যা বিশ্ববাণিজ্যকে অচলপ্রায় অবস্থায় নিয়ে আসে। তবে এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোষাগারে ২৩৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাজস্ব জমা হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় অনেক বেশি।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার ২ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই অস্থির নীতির কারণে বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। ট্রাম্পের এই শুল্কারোপ ও তার স্থগিতাদেশের ফলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ধারা স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম দিকে প্রতিবেশী দেশ কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ আরোপ করেন। তবে দুই দিনের মধ্যেই তা স্থগিত করা হয়। ২ এপ্রিল তিনি ‘মুক্ত দিবস’ ঘোষণা করে ৫ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন দেশের ওপর উচ্চ হারে শুল্কারোপ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেন। এতে ৫৭টি দেশের ওপর ১১ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপ আরোপের পরিকল্পনা থাকলেও পরে চীন ছাড়া অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে তা ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়। চীনের পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ শুল্কারোপ আরোপ করা হয়, যার জবাবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ১২৫ শতাংশ শুল্কারোপ আরোপ করে।

ভারতের ওপর আগস্টে ৫০ শতাংশ শুল্কারোপ আরোপ করা হয়। প্রথমে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করা হলেও রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে আরও ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ আরোপ করা হয়। ব্রাজিলের ওপরও একই হারে শুল্ক আরোপ করা হয়। ট্রাম্পের এই শুল্কারোপের প্রভাব পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপরও। বাংলাদেশে নতুন শুল্ক হার নির্ধারণ করা হয় ৩৭ শতাংশ, যা ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়। অন্যান্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক হার ১০ থেকে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।

বিশ্ববাণিজ্যে এই শুল্কারোপের প্রভাবে আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। রপ্তানি ও আমদানি খাতের উপর উচ্চ শুল্ক আরোপের কারণে সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দেশই তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়েছে। শুল্কারোপের কারণে কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, যা তীব্র মুদ্রাস্ফীতি এবং খুচরা মূল্যের বৃদ্ধির কারণ হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের শুল্কারোপের নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। কিছু দেশ নতুন শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার জন্য তাদের নিজস্ব কৌশল গ্রহণ করেছে। বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ট্রাম্পের নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেনি, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও এটি নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলো পুনঃপর্যালোচনা করতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সংস্থাগুলোর ওপরও এ সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে।

২০২৫ সালের এই শুল্কারোপের ধাক্কা বাংলাদেশের জন্যও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক হার নির্ধারণের ফলে খুচরা বাজারে মূল্য বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি, শিল্প এবং তৈরি পোশাক খাতের ওপর প্রভাব পড়েছে। দেশের রপ্তানি খাতও নতুন শুল্ক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এই শুল্কারোপ রাজনৈতিকভাবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও সরবরাহ চেইনের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ২০২৬ সালেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত