শুরুতেই ঝড় তোলা ফুটবল: কেন কিক-অফ থেকে প্রতিপক্ষের অর্ধে বল ঠেলে দেয় পিএসজি?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ৪০ বার
শুরুতেই ঝড় তোলা ফুটবল: কেন কিক-অফ থেকে প্রতিপক্ষের অর্ধে বল ঠেলে দেয় পিএসজি?

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মাঠে সবে রেফারির বাঁশি বেজেছে। বল ছুঁয়ে খেলা শুরুর মুহূর্ত—কেউ হয়তো বল পেছনে খেলবে, কেউ পাশে। কিন্তু প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি) সে পথে হাঁটে না। তারা মুহূর্তেই বল ঠেলে দেয় প্রতিপক্ষের অর্ধের গভীরে, এমন জায়গায় যেখান থেকে প্রতিপক্ষের স্নায়ুতে চেপে বসা যায়। এই কৌশল ফুটবলে এক নতুন আলোচনা তৈরি করেছে, বিশেষ করে যখন পিএসজির খেলায় শুরু থেকেই দেখা যায় আগ্রাসী প্রেসিং ও পরিকল্পিত আক্রমণের বিস্ফোরণ।

লুইস এনরিকের কোচিং দর্শনে এই কৌশল অনুশীলনের ফল নয়, বরং গভীর বিশ্লেষণের ফসল। আধুনিক ফুটবলে যেখানে প্রায় সব বড় দল নিজেদের অর্ধ থেকে বল ধরে আক্রমণ গড়ে, সেখানে এনরিকে ভিন্ন স্রোতে হাঁটছেন। কিক-অফেই বল ঠেলে দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে ঠেলে দেওয়া—তারপর শুরু হয় শ্বাসরুদ্ধকর চাপ।

এই কৌশলের মূল লক্ষ্য স্পষ্ট—প্রথম মিনিট থেকেই প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়া। যাতে তারা সংগঠিত হবার আগেই গোল হজম করে। উদাহরণ হিসেবে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ক্লাব বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের কথাই বলা যায়। সেই ম্যাচে পিএসজি প্রথম মিনিটেই বল প্রতিপক্ষ অর্ধে ঠেলে দিয়ে শুরু করে আগ্রাসী প্রেসিং। দ্রুতই আসে গোল, ম্যাচের গতিপথও নির্ধারিত হয় তখনই।

একসময় এমন শুরু মানে ছিল ডিফেন্সিভ মানসিকতা—বল ছেড়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরীক্ষা করা। অথচ পিএসজি এটিকে বানিয়েছে আক্রমণের প্রথম অস্ত্র। লুইস এনরিকের ভাষায়, “ফুটবলে ম্যাজিক বলে কিছু নেই। সবই কৌশল আর মানসিকতা।” এই কৌশলটির অনুপ্রেরণা এসেছে ফরাসি ক্লাব লিঁও থেকে। পিএসজির ক্ষেত্রে এটি রূপ নিয়েছে এক সফলতম আক্রমণাত্মক পরিকল্পনায়।

তথ্যই তা বলছে। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ক্লাব বিশ্বকাপে পিএসজি প্রথম ২০ মিনিটেই ১৭ ম্যাচে ৯ গোল করেছে। এর মধ্যে কোপা দে ফ্রান্স ফাইনালে রেইমসকে ২০ মিনিটেই দুইবার জালে বল পাঠায় তারা, বিরতিতে স্কোর দাঁড়ায় ৩-০। এরপর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে ১২ মিনিটেই হাকিমির গোল, আর ২০ মিনিটের মাথায় স্কোরলাইন ২-০।

কিক-অফেই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলাই পিএসজির নতুন শক্তি। কোয়ার্টার ফাইনালে অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে প্রথম দুই শটে দুই গোল, লিভারপুলের বিপক্ষে অ্যানফিল্ডে তৃতীয় সুযোগেই গোল। এমনকি ক্লাব বিশ্বকাপে ইন্টার মায়ামির বিপক্ষে মাত্র ছয় মিনিটেই গোল করে তারা। সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ২৪ মিনিটেই তিন গোল!

এনরিকে বলেন, “আমরা থামি না, কারণ আমরা জানি প্রথম গোলেই পুরো খেলার চিত্র পাল্টে যায়।”

তাদের কৌশল শুধু গোলেই সীমাবদ্ধ নয়, রি-গেইনের (পুনরায় বল দখলের) ক্ষেত্রেও তারা ভয়ংকর। রিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচে গোলকিক থেকে খেলা শুরুর পর পিএসজি বল হারায়, কিন্তু মাত্র চার সেকেন্ডে সাতজন খেলোয়াড় নেমে যান প্রতিরক্ষায়। ভিনিসিয়ুস-কারভাহালের মতো খেলোয়াড়দের থামাতে সামনে এসে কভার দেন ডেম্বেলে ও কভারাতস্কেলিয়া। এরপর ঠেকানো হয় চুয়ামেনির শট। পিএসজির আক্রমণ যেমন ধারালো, রক্ষণও তেমনি একটানা সজাগ ও সুশৃঙ্খল।

২০২৪-২৫ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ ফাস্ট ব্রেক শট (২৯টি) এবং দ্রুতগতির আক্রমণ থেকে সর্বোচ্চ গোল (৬টি) এসেছে পিএসজি-র দিক থেকে। অর্থাৎ কৌশলটি কেবল কার্যকরই নয়, বরং ফলপ্রসূও।

তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—চেলসি ও কোচ এনজো মারেস্কা। এই ম্যাচ হতে যাচ্ছে এক কৌশলের বিপরীতে আরেক কৌশলের সংঘর্ষ। এনরিকে যেমন বলেন, “আমরা প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণ করি না, আমরা নিজেদের পরিকল্পনা জানি—প্রথম মিনিটেই জিততে চাই।”

চেলসির জন্য হয়তো একটিই পরামর্শ—কয়েন টসে যেন পিএসজিকে বলের দখল না দেওয়া হয়। কারণ একবার বল পেলেই পিএসজি ম্যাচের প্রথম মিনিটেই করে ফেলতে পারে সব হিসাব গুলিয়ে।

শুরুতেই যে আক্রমণ ঝড় বয়ে যায়, তা সামাল দিতে না পারলে আধুনিক ফুটবলে আর ফিরে আসার জায়গা থাকে না। আর সেটাই পিএসজির সবচেয়ে বড় কৌশলগত ‘বিপদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব ফুটবলের বাকি সবার জন্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত