প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চাপ ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে। প্রবৃদ্ধির গতি এখনো মন্থর হলেও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার কিছু ইঙ্গিত মিলছে। তবে এই ইতিবাচক ধারার মাঝেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিকবিষয়ক বিভাগ প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাবনা ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশেই মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তুলনামূলক কম প্রবৃদ্ধির পর ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এটি আগের দুই বছরের তুলনায় একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে এখনও কম। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে, যেখানে ভারতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশে স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভুটান ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে, আর শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ থাকবে।
জাতিসংঘ বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে থাকলেও উচ্চ সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকা মধ্যম মেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও তুলনামূলক বেশি রয়ে গেছে। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবু খাদ্যপণ্য ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির দামের ঝুঁকি এখনো বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো সুদের হার কমানোর পথে হাঁটতে শুরু করেছে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। সুদের হার তুলনামূলকভাবে উচ্চ রাখার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, যদিও এতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে কিছুটা চাপ তৈরি হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পেছনে প্রধানত খাদ্যপণ্যের দাম এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির মূল্য বড় ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আমদানির খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য কিছু আশাব্যঞ্জক দিকও তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, কৃষি খাতে তুলনামূলক স্থিতিশীল উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং আইএমএফ-সমর্থিত সংস্কার কর্মসূচির কারণে অর্থনীতি ধীরে ধীরে গতি ফিরে পাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল থাকায় খাদ্য সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগেনি, যা মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমাতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে বলে মনে করছে জাতিসংঘ।
ঋণ পরিস্থিতি নিয়েও প্রতিবেদনে সতর্ক কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন করা হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দেশটি বর্তমানে মাঝারি ঝুঁকির ঋণ পরিস্থিতিতে রয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় নেই। তবে দ্রুত হারে সুদ ব্যয় বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে চাপ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায় দুর্বল থাকলে এবং বৈশ্বিক সুদের হার দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকলে বাজেট ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করা। উচ্চ সুদের হার মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, সুদের হার দ্রুত কমালে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের জন্য ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি অনুকূল নয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্কসহ নানা বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমতির দিকে, তবু উচ্চ সুদের হার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য রপ্তানি ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু রপ্তানিনির্ভর, তাই বৈশ্বিক চাহিদার ধীরগতি সরাসরি প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলোতে অর্ডার প্রবাহ স্থিতিশীল রাখা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতি সংস্কার ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘ।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেশি থাকায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির মতো খাতে ব্যয় সংকোচনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা না গেলে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের প্রতিবেদন বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে পুনরুদ্ধারের আশা ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ। সামনে এগিয়ে যেতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় জোরদার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল নির্ধারণই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।