প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
প্রিয় নবীর শহর মদিনার বুকে অবস্থিত পবিত্র কবরস্থান জান্নাতুল বাকি আজ কেবল ইতিহাস নয়, মুসলিম উম্মাহর এক অন্তহীন শোক ও স্মৃতির নাম। ঠিক এক শতাব্দী আগে—১৯২৫ সালে, ইসলামের ইতিহাসে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করা হয় যখন সৌদি আরবের শাসকগোষ্ঠী ‘ওয়াহাবি’ মতবাদ অনুসরণ করে ধ্বংস করে জান্নাতুল বাকির গম্বুজ, মাজার ও অসংখ্য ধর্মীয় স্থাপনা। অথচ এখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীগণ, কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.), চাচা হযরত আব্বাস (রা.), পুত্র হযরত ইব্রাহিম (রা.), খলিফা ওসমান (রা.), সহস্রাধিক সাহাবি, এবং নবী পরিবারভুক্ত অগণিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
এই ধ্বংসযজ্ঞ কোনো শত্রু জাতি বা অমুসলিম শাসকের হাতে হয়নি—হয়েছে মুসলিম পরিচয়ধারী একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে, যারা তাদের ব্যাখ্যামূলক মতাদর্শকে ‘শুদ্ধতা’র মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে একে ‘বিদআত’ বলে আখ্যা দেয়। এর আগেও ১৮০৬ সালে প্রথমবারের মতো জান্নাতুল বাকি আক্রমণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু ১৯২৫ সালের ঘটনাটি চূড়ান্তভাবে বদলে দেয় পবিত্র এ স্থানটির চেহারা, আবরণ এবং মাহাত্ম্যপ্রাপ্ত পরিমণ্ডল।
জান্নাতুল বাকির সূচনা ঘটে নবী করিম (সা.)-এর নিজ হাতে। তাঁর দুধ ভাই হযরত উসমান ইবনে মাজউন (রা.) মৃত্যুবরণ করলে তাঁকেই সর্বপ্রথম এখানে দাফন করা হয়। এরপর একে একে রাসূলের পরিবারের সদস্যগণ, সাহাবিগণ ও বহু ইসলামী মনীষী এ কবরস্থানে চিরনিদ্রা লাভ করেন। ওসমানীয় শাসনামলে এখানে নির্মাণ করা হয়েছিল অসংখ্য গম্বুজ, নামফলক, মসজিদ এবং ইসলামিক স্থাপত্যশৈলির নিদর্শন। সবই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয় একটি সিদ্ধান্তের ফলে—যার কার্যকারিতা চলতে থাকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত অজুহাতে।
বর্তমানে প্রতিদিন ফজর ও আসরের নামাজের পর খুব সীমিত সময়ের জন্য খুলে দেওয়া হয় জান্নাতুল বাকি। ঘড়ি ধরে মানুষের প্রবেশ হয়, কড়া নিরাপত্তায় প্রতিটি মুহূর্ত নজরদারির মধ্যে। কোনো চিহ্ন নেই, নেই পরিচিতির নামফলক—শুধু পাথর বিছানো কিছু কবরে আলাদা বাউন্ডারি টেনে রাখা হয়েছে। বলা হয়, সেখানেই শায়িত আছেন হযরত ফাতেমা (রা.), ইমাম হাসান (আ.), আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.), আকিল ইবনে আবু তালিব (রা.) সহ নবী পরিবারের সদস্যরা। তবু সেগুলোকেও ঘিরে রাখা হয়েছে যেন কোনো সাধারণ স্থান নয়—এমন অদৃশ্য সম্মান, অথচ দৃশ্যমান অবহেলা।
জান্নাতুল বাকিতে দু’দফা ‘সংস্কার’ চালায় সৌদি সরকার। প্রথমবার বাদশাহ ফয়সাল ও পরে বাদশাহ ফাহাদের আমলে। পুরো কবরস্থানের চারপাশে নির্মাণ করা হয় ১৭২৪ মিটার দীর্ঘ দেয়াল। ভেতরে থাকে গোসল, কাফনের ব্যবস্থা এবং মার্বেল পাথরের শোভামণ্ডিত বেষ্টনী। কিন্তু তবু সেসব সংস্কার হয়ে ওঠেনি যথার্থ, কারণ মূল ইতিহাসের চিহ্নগুলোকে ফিরিয়ে আনা হয়নি, বরং চাপা দেওয়া হয়েছে।
সৌদি আইনে কবর থেকে এক মুঠো মাটি বা পাথর নেওয়াও অপরাধ। এমনকি কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া করাও ‘নিষিদ্ধ’, যদিও ইতিহাসে নবীজির (সা.) জিয়ারত কালে সাহাবিদের জন্য দোয়ার প্রমাণ রয়েছে।
একজন প্রতিবেদকের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, “জান্নাতুল বাকি থেকে বেরিয়ে এসে চোখে জল এসে যায়। যে স্থানে এক সময় ছিল ইতিহাসের মহাব্যক্তিত্বদের রওজা, আজ সেখানে কেবল নীরবতা। মন কেবল বলে, এই জায়গাটিতেই একদিন আমাদের প্রিয়জনেরা ছিলেন, ছিলেন নবী পরিবারের সঙ্গীরা—আজ সেসব চিহ্নও নেই।”
জান্নাতুল বাকি শুধু একটি কবরস্থান নয়—এটি মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয়ের স্মারক। এখানকার প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে আছে ইসলামের ইতিহাস, ত্যাগ, আদর্শ ও ভালোবাসার অমোঘ প্রতিচ্ছবি। অথচ সেই ইতিহাস আজ ঘোলাটে হয়ে গেছে মতাদর্শের সংঘাতে, গোঁড়ামির ধ্বংসযজ্ঞে।
শত বছর পরেও মুসলমানদের হৃদয়ে জান্নাতুল বাকি এক অমোচনীয় নাম। সে গেটের দিকে প্রতিদিন তাকিয়ে থাকে লক্ষ হৃদয়—ভবিষ্যতের আশায়, মর্যাদার স্বপ্নে, আর প্রার্থনার আকুতিতে।
আল্লাহ যেন উম্মাহকে ঐক্য দান করেন এবং প্রিয়জনদের স্মৃতিকে যথার্থ সম্মান দিয়ে রক্ষা করার তাওফিক দেন—এই হোক প্রতিটি মুসলমানের প্রার্থনা।