প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাঙালি মুসলমান নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কল্পনা, স্বপ্ন ও প্রতিবাদের ভাষা এবার নতুন রূপে ধরা দিচ্ছে রুপালি পর্দায়। তাঁর বিশ্বখ্যাত সাহিত্যকর্ম ‘সুলতানার স্বপ্ন’ অবলম্বনে নির্মিত অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘সুলতানাস ড্রিম’ আগামী ১৬ জানুয়ারি থেকে দেশের প্রেক্ষাগৃহ স্টার সিনেপ্লেক্সে প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা কুড়ানো এই সিনেমাটি বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য নিঃসন্দেহে এক ভিন্নধর্মী ও তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন চলচ্চিত্রবোদ্ধারা।
মূলত স্প্যানিশ নির্মাতা ইসাবেল হারগুয়েরার হাত ধরে বেগম রোকেয়ার কল্পিত সেই নারীকেন্দ্রিক ইউটোপিয়ার গল্প নতুনভাবে প্রাণ পেয়েছে। স্প্যানিশ ভাষায় নির্মিত ৮৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের মূল নাম ‘এল সুয়েনো দে লা সুলতানা’, যার ইংরেজি নাম ‘সুলতানাস ড্রিম’। ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ সান সেবাস্তিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সিনেমাটির বিশ্বপ্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ইউরোপিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, গোয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ফিল্মফেস্ট হামবুর্গ, লিডস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে প্রশংসা অর্জন করে এটি।
বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে অবশেষে সিনেমাটি আসছে বাংলাদেশে, সেই ভূখণ্ডে যার একজন চিন্তাবিদ ও লেখকের কল্পনা থেকে জন্ম হয়েছিল ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এর মতো বৈপ্লবিক সাহিত্য। নির্মাতাদের মতে, এই মুক্তি শুধু একটি সিনেমা প্রদর্শনের ঘটনা নয়, বরং বেগম রোকেয়ার উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রয়াস।
১৯০৫ সালে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ‘Sultana’s Dream’ ছিল উপমহাদেশের সাহিত্য ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী কল্পকাহিনি। যেখানে পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থার উল্টো চিত্র এঁকে বেগম রোকেয়া তুলে ধরেছিলেন এক নারীশাসিত রাষ্ট্র—‘লেডিল্যান্ড’। সেখানে নারীরাই রাষ্ট্র পরিচালনা করে, বিজ্ঞানে অগ্রগামী, সমাজব্যবস্থায় যুক্তিবাদী এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতীক। বিপরীতে পুরুষেরা গৃহবন্দি, যাদের কাজ সীমাবদ্ধ ঘরের ভেতরেই। সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এমন কল্পনা ছিল রীতিমতো বিপ্লবী।
পরবর্তীতে ১৯২২ সালে বেগম রোকেয়া নিজেই কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করেন ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে। বাংলা ভাষায় প্রকাশের পর এটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশেষ করে বাংলার নারী আন্দোলনে এক শক্তিশালী প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। নারীশিক্ষা, নারীস্বাধীনতা ও সমাজসংস্কারের প্রশ্নে বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা আজও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন গবেষকরা।
এই সাহিত্যকর্মের সঙ্গে নির্মাতা ইসাবেল হারগুয়েরার পরিচয়ও ছিল প্রায় আকস্মিক। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ২০১২ সালে দিল্লি সফরের সময় প্রবল বৃষ্টির এক দিনে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন একটি আর্ট গ্যালারিতে। সেখানেই তাঁর হাতে আসে ‘Sultana’s Dream’ বইটি। বইটি পড়ে তিনি বিস্মিত হন এবং একই সঙ্গে গভীরভাবে আলোড়িত হন। ইসাবেল বলেন, এত বছর আগে লেখা একটি রচনা, যেখানে নারীদের জন্য কল্পনা করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী—এটা যেন প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ার মতো অভিজ্ঞতা ছিল। সেই মুহূর্তেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এই গল্প তিনি সিনেমার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন।
‘সুলতানাস ড্রিম’ ইসাবেল হারগুয়েরার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ফিচার ফিল্ম। সিনেমাটির চিত্রনাট্য তিনি যৌথভাবে লিখেছেন জিয়ানমার্কোর সঙ্গে। অ্যানিমেশন হলেও এটি কেবল শিশুদের জন্য নয়; বরং প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের চিন্তা ও উপলব্ধিকে নাড়া দেওয়ার মতো গভীরতা রয়েছে এতে। সিনেমাটিতে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও বাস্ক—মোট ছয়টি ভাষার ব্যবহার রয়েছে, যা এটিকে একটি সত্যিকারের বহুভাষিক ও আন্তর্জাতিক শিল্পকর্মে পরিণত করেছে।
সিনেমাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সংগীত। এতে কলকাতার জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও গীতিকার মৌসুমী ভৌমিকের লেখা একটি গান ব্যবহৃত হয়েছে। গানটির সংগীতায়োজন করেছেন তাজদির জুনায়েদ এবং কণ্ঠ দিয়েছেন দীপান্বিতা আচার্য। গানটি সিনেমার আবহ ও আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছে বলে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট।
প্রযোজনার দিক থেকেও ‘সুলতানাস ড্রিম’ একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফল। স্পেন ও জার্মানির পাঁচটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে সিনেমাটি নির্মাণ করেছে। ফলে এর ভিজ্যুয়াল ভাষা, অ্যানিমেশন স্টাইল ও গল্প বলার ধরনে ইউরোপীয় শিল্পভাবনার সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যচেতনার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়।
বাংলাদেশে সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাহিত্যপ্রেমী, নারী অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সিনেমা নিয়ে কৌতূহল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই মনে করছেন, পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ থাকা বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারাকে এই সিনেমা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও জীবন্ত করে তুলবে।
স্টার সিনেপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দর্শকদের আগ্রহের কথা বিবেচনায় রেখে সিনেমাটির প্রদর্শনীসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দর্শক সাড়া ভালো পেলে প্রদর্শনীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি বাংলাদেশে বিকল্পধারার ও আন্তর্জাতিক শিল্পমানের সিনেমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, ‘সুলতানাস ড্রিম’ শুধু একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নয়, বরং এটি ইতিহাস, সাহিত্য ও নারীমুক্তির চেতনাকে একসূত্রে গেঁথে দেওয়া এক শিল্পভাষ্য। বেগম রোকেয়ার শতবর্ষ আগের স্বপ্ন যে আজও কতটা জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক—এই সিনেমা তারই এক নতুন প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে।