বিবাহবার্ষিকীতে ডিভোর্স পেপার, সেলিনার জীবনের কঠিন সত্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
বিবাহবার্ষিকীতে ডিভোর্স পেপার, সেলিনার জীবনের কঠিন সত্য

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

একসময় বলিউডের পর্দায় গ্ল্যামার, আত্মবিশ্বাস আর সাহসী উপস্থিতির জন্য পরিচিত ছিলেন সেলিনা জেটলি। দুই হাজার দশকের শুরুতে একের পর এক বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকের নজর কাড়েন। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রুপালি পর্দা থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন এই অভিনেত্রী, তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আজও বারবার উঠে আসছে আলোচনার কেন্দ্রে। সম্প্রতি নিজের জীবনের অন্ধকার অধ্যায় প্রকাশ্যে এনে সেলিনা এমন এক বাস্তবতার কথা বলেছেন, যা শুধু একজন অভিনেত্রীর নয়, বরং বহু নারীর নীরব যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি।

২০১১ সালে অস্ট্রিয়ান ব্যবসায়ী পিটার হাগকে বিয়ে করেন সেলিনা জেটলি। বিয়ের পরপরই তিনি বলিউড ছাড়েন এবং স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যান। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়েছিল, তাঁর জীবন যেন স্বপ্নের মতো—বিদেশে বসবাস, পরিবার, সন্তান আর আলোচনার বাইরে এক শান্ত জীবন। কিন্তু সেই ঝলমলে আবরণের আড়ালে যে ভয়ংকর বাস্তবতা লুকিয়ে ছিল, তা এতদিন জানতেন না অনেকে। সম্প্রতি নিজেই সামনে এসে সেলিনা জানিয়েছেন, তাঁর বিবাহিত জীবন ছিল শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপমান এবং দীর্ঘদিনের মানসিক ট্রমায় ভরা।

সেলিনার বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিচ্ছেদ কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়। বছরের পর বছর ধরে চলা নির্যাতন, অবহেলা এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে একসময় তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের সম্মান ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে হলে এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, একজন নারী হিসেবে নিজেকে বাঁচানোর এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তাঁকে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে—নিজের সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে।

এক আবেগঘন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে সেলিনা জানান, ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর রাত প্রায় একটার দিকে তাঁকে অস্ট্রিয়া ছাড়তে হয়। সেই রাতটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। প্রতিবেশীদের সহায়তায়, অত্যন্ত অল্প কিছু টাকা নিয়ে, গভীর রাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। সেই সময় নিজের সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে আসার সুযোগ পাননি। নিরাপত্তার প্রশ্নে এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতায় সন্তানদের সেখানেই রেখে আসতে হয় তাঁকে।

সেলিনার ভাষায়, নিজের আত্মসম্মানের পক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি যেন নিজের সন্তানদের হারিয়েছেন। এই কথাটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গা হয়ে উঠেছে। তিনি দাবি করেছেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী যৌথ অভিভাবকত্ব থাকার কথা হলেও তাঁকে সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি ফোনে কথা বলার সুযোগও মিলছে না। তাঁর অভিযোগ, সন্তানদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

এই মানসিক যন্ত্রণার পাশাপাশি সেলিনাকে লড়তে হচ্ছে আইনি জটিলতার সঙ্গেও। ভারতে ফিরে আসার পর তিনি জানান, নিজের বাড়িতে প্রবেশের জন্যও তাঁকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, স্বামী সেই সম্পত্তির ওপর নিজের অধিকার দাবি করেছিলেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে গিয়ে তাঁকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হয়েছে। একজন প্রাক্তন অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এই আইনি লড়াই তাঁর আর্থিক অবস্থাকে কঠিন চাপে ফেলেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে সেলিনার জীবনের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা সামনে আসে তাঁদের বিবাহবার্ষিকীকে ঘিরে। সেলিনা নিজেই জানান, তাঁদের ১৫তম বিবাহবার্ষিকীর দিন স্বামী তাঁকে পোস্ট অফিসে নিয়ে যান। বলা হয়েছিল, তাঁর জন্য একটি বিশেষ উপহার এসেছে। বিবাহবার্ষিকীর দিনে এমন কথা শুনে যে কেউই আনন্দিত হবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে খামটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়, সেটি ছিল ডিভোর্সের কাগজ। সেলিনার ভাষায়, সেটিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে নির্মম ‘বার্ষিকী উপহার’।

এই ঘটনার পরও তিনি সন্তানদের কথা ভেবে একাধিকবার শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানান সেলিনা। কিন্তু তাঁর সামনে যে শর্তগুলো রাখা হয়েছিল, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁর দাবি, তাঁকে বিয়ের আগের নিজের সম্পত্তির অধিকার ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে একজন নারী ও একজন মা হিসেবে তাঁর স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং মর্যাদা খর্ব করার শর্ত মানতে বলা হয়। এই পরিস্থিতিতে তিনি স্পষ্ট করে বুঝতে পারেন, এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অর্থ নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।

ব্যক্তিগত জীবনের এই ভয়াবহ সংকটের মধ্যেই সেলিনা আরও একটি বড় দুঃসংবাদের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর ভাই বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কারাবন্দী। ভাইয়ের আইনি সহায়তার জন্যও তাঁকে নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। একদিকে সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে সেলিনার জীবন এখন একাধিক লড়াইয়ের মঞ্চ।

‘নো এন্ট্রি’, ‘জানাশিন’, ‘টম, ডিক অ্যান্ড হ্যারি’, ‘থ্যাঙ্ক ইউ’-এর মতো জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করা সেলিনা জেটলি হয়তো আজ আর বলিউডের আলোঝলমলে দুনিয়ায় সক্রিয় নন। তবে তাঁর এই ব্যক্তিগত গল্প নতুন করে সামনে এনেছে এমন এক বাস্তবতা, যা সমাজে প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়। ঘরের চার দেয়ালের আড়ালে চলা নির্যাতন, মানসিক চাপে টিকে থাকার সংগ্রাম এবং সন্তানদের জন্য নিঃশব্দ ত্যাগ—এই সবকিছুই বহু নারীর জীবনের নিত্যদিনের গল্প।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সেলিনার মতো একজন পরিচিত মুখ যখন নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনেন, তখন তা অন্য নারীদেরও কথা বলার সাহস জোগায়। তাঁর গল্প শুধুই একজন অভিনেত্রীর দুঃখগাথা নয়; এটি নারীর অধিকার, আত্মমর্যাদা এবং নিরাপত্তার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সেলিনা জেটলির জীবনের এই অধ্যায় মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নির্যাতন কখনোই ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি সামাজিক সচেতনতার বিষয়। আর সেই সচেতনতা তৈরি করতেই হয়তো তাঁর এই কঠিন সত্যের প্রকাশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত