প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও শুল্ক-রাজনীতির তাস খেলে নতুন করে বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছেন। এবারের লক্ষ্য সরাসরি এশিয়ার দেশগুলো। জাপান থেকে শুরু করে দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা—মোট ২৩টি দেশের জন্য নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা ইতিমধ্যেই টোকিওসহ এশীয় অর্থনীতিকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা একে ‘গভীরভাবে দুঃখজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বহুদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন চাপ জাপান কল্পনাও করেনি।
বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের এই শুল্ক-কৌশল আর অস্থায়ী হুমকি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি চাপ। এশিয়ার বহু দেশের অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, গাড়িশিল্প আর পোশাক খাতই এই অঞ্চলের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। জাপানের গাড়িশিল্প এমনিতেই বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস আর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পড়েছে। এর মধ্যে নতুন ২৫ শতাংশ শুল্ক এই খাতের জন্য বড় ধাক্কা। একই সঙ্গে জাপান চালের বাজার উন্মুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেদের কৃষিখাত রক্ষার চেষ্টা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানো ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, শুল্ক আরোপের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও তিনি পিছিয়ে যাবেন না। এবার শুধু জাপান নয়, কানাডার ওপরও ৩৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের জন্য নতুন শুল্কের চিঠি অনলাইনে প্রকাশ করে ‘রাজনৈতিক নাটক’ তৈরি করেছেন ট্রাম্প—এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়েছে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া কিছুটা সময় নিতে পারবে আর্থিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো—যেমন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম—সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তও এ অঞ্চলের জন্য বড় ধাক্কা। কোনো দেশ যদি চীনা পণ্য নিজেদের নামে রপ্তানি করে, সেখানেও শুল্ক বসবে।
চুক্তি নিয়ে অস্বচ্ছতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ক্যাপরির মতে, শুল্ক শুধু চূড়ান্ত পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে, নাকি কাঁচামাল ও উপাদানও এর আওতায় পড়বে—এটি এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে এশীয় সরবরাহ চেইন, প্রযুক্তি খাত ও উৎপাদকরা অনিশ্চয়তার ভেতরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জাপান অবশ্য সময় নষ্ট করেনি। শুল্ক ঘোষণা হওয়ার পরদিনই টোকিওতে শত শত ‘সহায়তা কেন্দ্র’ খোলা হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকরা আইনি ও আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন। জাপানের সংসদের উচ্চকক্ষের নির্বাচন জুলাই মাসেই। রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারণা, এই নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত করবে না। ট্রাম্পও আগস্টের মধ্যে সমঝোতার সময়সীমা বেধে দিয়েছেন। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ সহজে মীমাংসা হচ্ছে না।
এদিকে এই শুল্ক-যুদ্ধের ফাঁদে পড়েই অনেকে বলছেন, সবচেয়ে বড় লাভবান হতে পারে চীন। ট্রাম্পের খোলা হুমকিতে এশিয়ার দেশগুলো নতুন বাজার খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। চীনের বাজার এই জায়গায় বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানকে ‘অস্থিতিশীল’ হিসেবে তুলে ধরে চীন নিজেদের বাণিজ্য অংশীদারদের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের চেষ্টা করছে।
তবে চীনের জন্যও সব সহজ নয়। এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে চীনের সম্পর্ক সর্বদা বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজার তাৎক্ষণিকভাবে অন্যত্র সরানোও সম্ভব নয়। তবু বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুল্কের এই চাপ যুক্তরাষ্ট্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ বহুজাতিক কোম্পানি, সরবরাহ চেইন এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাই এর খেসারত দেবে।
সিঙ্গাপুরের ইউনাইটেড ওভারসিজ ব্যাংকের গবেষক সান টেক কিন মনে করছেন, সময়সীমা যত এগিয়ে আসবে, ততই আবার নতুন করে আলোচনার চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে ট্রাম্পের ভাষার অস্পষ্টতা ও রাজনৈতিক নাটক নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে রাখতে বাধ্য করছে। ফলে কোনো কোনো দেশ শুল্কের এই হুমকিকে সাময়িক ধাক্কা হিসেবে দেখছে, আবার কেউ কেউ গোপনে বিকল্প চুক্তি গড়ার সুযোগ খুঁজছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ যে বিশ্ব বাণিজ্যে বড় এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তা নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই। কে জিতবে, কে হারবে—তা এখনই বলা মুশকিল। তবে এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত এ শুল্ক যুদ্ধের ঢেউ যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় সত্য।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন