প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফুটবলের জমজমাট উৎসব ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল এবার কেবল মাঠের খেলা নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন এক বিতর্কিত রাজনৈতিক মুখ—মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে যখন ইংলিশ জায়ান্ট চেলসি শিরোপা জিতে উদ্যাপনে ব্যস্ত, তখন বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দিতে গিয়ে দর্শকদের দুয়ো ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন ট্রাম্প।
চ্যাম্পিয়ন চেলসির হাতে ট্রফি তুলে দিতে যখন ট্রাম্প মাঠে প্রবেশ করেন, তখনই গ্যালারির একাংশ থেকে শুরু হয় উচ্চস্বরে দুয়ো ধ্বনি। তার আগমনের মুহূর্তেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে মঞ্চে আসেন তিনি। গ্যালারির এই প্রতিক্রিয়াকে সামাল দিতে আয়োজকরা দ্রুত স্টেডিয়ামের স্পিকারে সংগীতের ভলিউম বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে ভিডিও ক্লিপগুলো।
ম্যাচ শুরুর আগেও গ্যালারিতে এক ধরনের বিভক্তি লক্ষ করা যায়। জাতীয় সংগীত চলাকালে স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে যখন ট্রাম্পকে স্যালুট দিতে দেখা যায়, তখনও কিছু দর্শক দুয়ো দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। ক্যামেরা তখন দ্রুত অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে বিতর্ক আরও না ছড়ায়। তবে পুরো সময়জুড়েই ট্রাম্প ছিলেন বেশ স্বতঃস্ফূর্ত। লাল টাই পরে, হাসিমুখে চেলসি অধিনায়ক রিস জেমসের হাতে ট্রফি তুলে দেন তিনি। সেরা খেলোয়াড় হিসেবে কোল পালমারকে ‘গোল্ডেন বল’ পুরস্কার দেন এবং বিজিত পিএসজির খেলোয়াড়দের সঙ্গেও করমর্দনে অংশ নেন।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ট্রাম্পের এই উপস্থিতি। ঠিক এক বছর আগে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পেনসিলভানিয়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে গিয়ে ট্রাম্প এক হত্যাচেষ্টা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পান। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার সমর্থকদের কাছে এই দিনটি ‘বেঁচে ফেরার দিবস’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে উঠেছে। এক বছর পূর্তিতে ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে উপস্থিত হয়ে তিনি যেন আবারও নিজেকে সামনে তুলে ধরতে চাইলেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চান ট্রাম্প। ২০২৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপ এবং ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ—এই দুটি মেগা ইভেন্টকে সামনে রেখে ট্রাম্প বারবার উচ্চারণ করছেন “গোল্ডেন এজ অব আমেরিকা”। এই বিশ্বকাপকে তিনি শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং আমেরিকার নতুন উদ্দীপনার প্রতীক হিসেবে দেখতে চান। সে লক্ষ্যেই হোয়াইট হাউসে একটি বিশেষ ‘টাস্ক ফোর্স’ গঠন করা হয়েছে, যারা আগামী আয়োজনগুলোর প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে।
এই দুটি বিশ্বমঞ্চ আয়োজনের সঙ্গে আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত মিলে যাচ্ছে—২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র উদ্যাপন করবে তার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি। ট্রাম্প সেই উদ্যাপনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় করে তুলতে চান এবং ক্রীড়াঙ্গনকে এর কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চান।
তবে সবকিছুর বাইরেও ছিল একটি ব্যক্তিগত সংযোগ। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো জানান, ট্রাম্পের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ শুধুই কৌশলগত নয়। তার ছোট ছেলে ব্যারন একজন ফুটবলপ্রেমী, আর সেই সূত্রেই বাবাও ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। এমনকি ছোটবেলায় নিউ ইয়র্ক মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে ট্রাম্প এক মৌসুম ফুটবলও খেলেছিলেন।
সবমিলিয়ে চেলসির শিরোপাজয়ের আনন্দ যেমন ছিল, তেমনি ফাইনালের দৃশ্যপটে ট্রাম্পের উপস্থিতি ফুটবল বিশ্বকে এনে দিয়েছে বাড়তি এক রাজনৈতিক রঙ। চেলসি-পিএসজি ম্যাচ শেষে রয়ে গেল প্রশ্ন—২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও কি এভাবেই রাজনীতি আর খেলার সমান্তরাল পথচলা চলবে? সময়ই হয়তো সে উত্তর দেবে। তবে এই ফাইনালের একটি কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়—খেলাধুলার রাজনীতি কখনো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে।