নতুন বেতন কাঠামোতে ৮০ হাজার কোটি টাকার চাপ, সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ বার
নতুন বেতন কাঠামোতে ৮০ হাজার কোটি টাকার চাপ, সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী সরকার

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতা কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হবে, তার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকেই নিতে হবে—এমনই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তাঁর ভাষায়, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে বছরে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে, যার অর্থের সংস্থান সরকারকেই করতে হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরবর্তী সরকার চাইলে এই সুপারিশ বাস্তবায়ন নাও করতে পারে।

মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনেক দিন ধরেই প্রয়োজন ছিল। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত বেতন কাঠামোর কারণে সরকারি কর্মচারীরা বাস্তব সংকটে পড়েছেন। সে বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই পে কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং তারা সুপারিশ তৈরি করেছে। তবে এই সুপারিশ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হবে।

অর্থ উপদেষ্টা জানান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতার সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত পে কমিশন আজ বুধবার বিকেল ৫টায় তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান সব সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করবেন। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা নিজে এবং অর্থ সচিব উপস্থিত থাকবেন। এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে আর মাত্র প্রায় ২০ দিন সময় রয়েছে। এই স্বল্প সময়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে কেন? বাস্তবায়ন হবে সরকারের নিয়ম অনুযায়ী। পে কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়ন হয় না। এ বিষয়ে কয়েকটি কমিটি রয়েছে, তারা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করবে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, কমিশনের সুপারিশ যাচাই-বাছাই, মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সাধারণত তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। ফলে এই সরকার পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।

তবে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এটাও স্পষ্ট করেন যে, প্রতিবেদনটি জমা দিয়ে যাওয়াটাই একটি বড় অর্জন। একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেননি যে, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করবে না। অর্থাৎ বিষয়টি এখনো নীতিগত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছে।

বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। পে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে এই ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এই অঙ্ক দেশের বর্তমান রাজস্ব বাস্তবতা ও আর্থিক সক্ষমতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, পে কমিশন নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা ভাবছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে। আর পুরো কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে। এতে করে সরকারের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিস্তারিত দিকগুলোও ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এটি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেডে বর্তমানে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থাকলেও তা বাড়িয়ে এক লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার প্রস্তাব এসেছে, যাতে বেতন কাঠামোয় ভারসাম্য বজায় থাকে এবং নিচের স্তরের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি উপকৃত হন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন ও ভাতা খাতে ইতিমধ্যে ২২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, নতুন বেতন কাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই বাড়তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পে কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, পুরো কাঠামো কার্যকর করতে যে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে, তা জোগাড় করতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার দরকার হবে।

বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন। সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের আয় কাঠামো বদলালে এর প্রভাব অর্থনীতি ও বাজেট উভয় ক্ষেত্রেই পড়বে—এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও পরে তা স্থগিত হয়। তবে গত জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু রয়েছে, যা নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার বিষয়টিও কমিশনের সুপারিশে গুরুত্ব পেয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা জানান, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সন্তুষ্ট হবেন বলে তিনি আশা করেন। তাঁর ভাষায়, পে কমিশনের চেয়ারম্যান নিজেও জানিয়েছেন যে কমিশন অত্যন্ত বাস্তবধর্মীভাবে কাজ করেছে। দেশের আর্থিক সামর্থ্য, সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখেই যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপও সুপারিশ প্রণয়নের সময় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

বেতন বৃদ্ধি বাজারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাজারে এর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না বলে তাঁর বিশ্বাস। সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় এই বেতন বৃদ্ধি কোনো নির্বাচনী প্রভাব ফেলতে পারে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।

অর্থ উপদেষ্টা আরও জানান, আগামী ২৭ জানুয়ারি করনীতি-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেবেন গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার। ভবিষ্যৎ রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অনেক দিকই ওই প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে। নতুন বেতন কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তার সঙ্গে এই করনীতি সংস্কারের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সব মিলিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অর্থনৈতিক চাপ ও নীতিগত সিদ্ধান্তের জটিলতা। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায় শেষ হলেও, বাস্তবায়ন প্রশ্নে শেষ কথা বলবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার—এটাই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত