প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়ার তেল কেনার ওপর দেওয়া সাময়িক ছাড়ের মেয়াদ বৃদ্ধি। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক চাপের এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন আবারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, নির্দিষ্ট শর্তে রাশিয়ার তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির সুযোগ আরও কিছুদিন বহাল থাকবে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জ্বালানি অর্থনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শুক্রবার জানানো হয়, আগে দেওয়া ৩০ দিনের যে ছাড় ১১ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা পরিবর্তন করে এখন ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে দেশগুলো সমুদ্রপথে পরিবাহিত রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি পণ্য আমদানি করতে পারবে। তবে এই ছাড়ের আওতায় ইরান, কিউবা ও উত্তর কোরিয়া অন্তর্ভুক্ত নয় বলে স্পষ্ট করেছে মার্কিন প্রশাসন।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময় এলো, যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং সরবরাহ নিয়ে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির অনিশ্চিত পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে অনেকেই বাজার স্থিতিশীল করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং বৈশ্বিক বাজারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি রোধ করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। এক মুখপাত্র বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্য আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু দেশ বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহে চাপের মধ্যে রয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। দুই দলের একাধিক আইনপ্রণেতা অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখার পরিবর্তে এই ধরনের ছাড় দেওয়া আসলে নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। তাদের মতে, এতে রাশিয়ার অর্থনীতি পুনরায় শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে উদ্বেগজনক।
একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও এ নিয়ে আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই সময়ে রাশিয়ার ওপর থেকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা উচিত নয়। তার মতে, যুদ্ধ চলমান অবস্থায় এ ধরনের পদক্ষেপ পশ্চিমা ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন। সরবরাহ সংকট এড়াতে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু নমনীয়তা প্রয়োজন। গত মাসে এই ধরনের ছাড়ের কারণে প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করেছে, যা সাময়িকভাবে বাজারে চাপ কমিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তেলের সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, এই সংঘাত ইতিমধ্যেই ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
সংস্থাটির মতে, অষ্টম সপ্তাহে প্রবেশ করা এই সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের ৮০টিরও বেশি তেল ও গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি নিয়েও অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
সম্প্রতি ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, তাদের বন্দর ও সমুদ্রপথে মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এই হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম আবারও ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেলের দাম কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি বাজার এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে কিছু সহযোগী দেশ, যারা সরবরাহ সংকটের কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। ভারতসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে টেলিফোনে এ বিষয়ে কথা বলেছেন বলেও সূত্র জানিয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রুশ রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তার মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল করতে সহায়তা করছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের সাময়িক ছাড় ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল করার সহজ উপায় খুবই সীমিত হয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাশিয়ার তেল কেনার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন জ্বালানি বাজারে স্বস্তি এনে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।