প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র কোরআনের বাণীতে বারবার উঠে এসেছে সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংঘাত এবং শেষ পর্যন্ত সত্যের বিজয় অনিবার্য হওয়ার ঘোষণা। মানবসভ্যতার ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা এবং ব্যক্তিজীবনের নৈতিক দিকনির্দেশনায় এই বার্তা গভীর তাৎপর্য বহন করে। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, সত্য কখনো বিলুপ্ত হয় না; বরং তা মিথ্যার ওপর বিজয়ী হয় এবং মিথ্যাকে ধ্বংস করে দেয়।
এ প্রসঙ্গে কোরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত হলো—
بَلۡ نَقۡذِفُ بِالۡحَقِّ عَلَی الۡبَاطِلِ فَیَدۡمَغُهٗ فَاِذَا هُوَ زَاهِقٌ ؕ وَ لَكُمُ الۡوَیۡلُ مِمَّا تَصِفُوۡنَ
এই আয়াতের সরল অনুবাদে বলা হয়েছে, “বরং আমরা সত্যকে মিথ্যার ওপর নিক্ষেপ করি, ফলে সত্য মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, আর মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর তোমাদের জন্য ধ্বংস, যা তোমরা বর্ণনা করো।”
এই আয়াত শুধু একটি ধর্মীয় বার্তা নয়, বরং মানবজীবনের নৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি চিরন্তন সত্য। এখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, সত্যের শক্তি এমন যে তা মিথ্যাকে ধ্বংস করে দেয়, যতই মিথ্যা শক্তিশালী বা প্রচলিত হোক না কেন।
ইসলামি ব্যাখ্যাকারদের মতে, বিশেষ করে ইবন কাসিরের তাফসির অনুযায়ী, এখানে “দম্গ” শব্দটি এমন আঘাতকে বোঝায় যা মাথার মগজ পর্যন্ত পৌঁছে ধ্বংস করে দেয়। আর “জাহিক” শব্দের অর্থ হলো সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ সত্য যখন মিথ্যার ওপর আঘাত হানে, তখন মিথ্যার অস্তিত্ব আর টিকে থাকতে পারে না।
তাফসির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণারও খণ্ডন করেছেন। তারা আল্লাহ সম্পর্কে নানা কু-ধারণা পোষণ করত, যেমন আল্লাহ উদ্দেশ্যহীনভাবে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন বা তাঁর সন্তান ও অংশীদার রয়েছে—নাউজুবিল্লাহ। কোরআন এসব মিথ্যা ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে সত্যের অবস্থানকে সুস্পষ্ট করেছে।
পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে এই পৃথিবীর সৃষ্টি কোনো খেলাচ্ছলে হয়নি। বরং এর পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, যার অন্যতম হলো ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করা এবং সত্যকে বিজয়ী করা। পৃথিবীতে চলমান ভালো-মন্দের সংঘাত মূলত মানবজাতির পরীক্ষা, যেখানে শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাফসিরে আহসানুল বায়ান, কুরতুবি ও অন্যান্য প্রখ্যাত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সত্যকে অস্বীকার করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কারণ মিথ্যা যতই আকর্ষণীয় বা শক্তিশালী মনে হোক না কেন, তার ভিত্তি দুর্বল। সময়ের পরীক্ষায় তা টিকতে পারে না। অপরদিকে সত্য ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়ে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করে।
এই আয়াত থেকে পাওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মিথ্যার ওপর কখনো দীর্ঘমেয়াদে নির্ভর করা যায় না। ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র—যেখানেই মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে পড়ে। ইতিহাসও এ সত্যের সাক্ষ্য দেয় যে, সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোরআনের এই বার্তা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক নীতি। কারণ সমাজে স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সত্যের ভিত্তি শক্তিশালী হওয়া জরুরি। মিথ্যা, অপপ্রচার ও গুজব সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত সামাজিক ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই আয়াত থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো সত্যকে শুধু জানা যথেষ্ট নয়; বরং তা প্রতিষ্ঠা করা ও প্রচার করাও দায়িত্ব। একজন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব হলো সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে সচেতন থাকা।
আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যুগে যেখানে গুজব ও ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে এই কোরআনিক শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় ভুল তথ্য বা অপপ্রচার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে কোরআনের শিক্ষা আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, মিথ্যা তথ্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদরা বলেন, সত্যের শক্তি ধৈর্য, সততা এবং ন্যায়পরায়ণতার ওপর নির্ভরশীল। একজন মানুষ যখন সত্যের পথে অটল থাকে, তখন সে হয়তো সাময়িকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সফল হয়।
কোরআনের এই আয়াত আমাদের আরও শেখায় যে, সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো শক্তিই স্থায়ী হতে পারে না। ইতিহাসে বহু শক্তিশালী সাম্রাজ্য ও মতবাদ ধ্বংস হয়েছে শুধুমাত্র সত্যকে অস্বীকার করার কারণে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই কোরআনিক বাণী মানবজীবনের জন্য একটি চিরন্তন দিকনির্দেশনা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যের পথ কঠিন হলেও তা-ই স্থায়ী এবং বিজয়ী। মিথ্যা সাময়িকভাবে প্রভাব বিস্তার করলেও শেষ পর্যন্ত তা বিলীন হয়ে যায়।
সুতরাং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। কোরআনের এই বার্তা আমাদের শেখায়, সত্যের পথে থাকাই চূড়ান্ত সাফল্যের পথ।