প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে যে ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধির গল্প’ দেশবাসী শুনে এসেছে, বাস্তবে তার ভিত যে কতটা নড়বড়ে ছিল, সেটি এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রবৃদ্ধির চটকদার পরিসংখ্যানের আড়ালে জমে উঠেছিল ঋণের পাহাড়, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোগত সংস্কারের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি। এরই পরিণতিতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খুব কম দেশই আছে, যেখানে মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সেই বিরল ও উদ্বেগজনক উদাহরণে পরিণত হয়েছিল।
ব্যাংক খাতের এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আস্থার গভীর সংকট। ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে পুঁজি পাচারের অভিযোগ ওঠে ব্যাপকভাবে। মূল্যস্ফীতি এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম চাপে ফেলে। সুদের হারে কৃত্রিম সীমা আরোপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর নীতি বাজারে অর্থের জোগান বাড়ালেও বাস্তবে তা মূল্যস্ফীতির আগুনকে আরও উসকে দেয়। পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতা আড়াল করতে তথ্যের অস্বচ্ছতা বড় ভূমিকা রাখে, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষেত্র তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে জুলাই অভ্যুত্থান এবং গণমানুষের দাবির মুখে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমদানিতে কড়াকড়ি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু এবং প্রবাসী আয়ে উৎসাহ দেওয়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রিজার্ভ প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং ব্যাংক খাতের সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সমস্যার মূল খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই ঘুরে দাঁড়ানো এখনো নাজুক। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় গত বছরের শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যদিও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তরণ এবং দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা স্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। তাঁকে ঘিরে ব্যবসায়ী সমাজসহ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে, যা মধ্যমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় পাঁচ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও দেশের পুঁজিবাজার সেই আশার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঘোরাফেরা করছে। বহু ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির শেয়ারের দাম তলানিতে ঠেকেছে। প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক বাজারগুলো যখন ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া বিনিয়োগকারীদের হতাশ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পশ্চাৎপদতার মূল কারণ কাঠামোগত দুর্বলতা। দীর্ঘদিন ধরে ভালো মানের নতুন কোনো কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা শিল্পখাতকে শেয়ারবাজার থেকে দূরে রেখেছে। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্র ও ফিক্সড ইনকাম স্কিমে উচ্চ সুদহার বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজার থেকে সরিয়ে নিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব বাজারে তারল্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা ও আস্থাহীনতা এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে, যখন সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, রিজার্ভের উন্নতি এবং রাজনৈতিক উত্তরণ পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সংকীর্ণ কিন্তু অর্থবহ সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত ও সাহসী সংস্কার কর্মসূচি। বাজারের কাঠামোগত বাধাগুলো দূর না করলে পুঁজিবাজার কখনোই টেকসই উন্নয়নের পথে ফিরতে পারবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে রাজস্ব নীতির মাধ্যমে শক্তিশালী প্রণোদনা দিতে হবে। তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের ব্যবধান বাড়িয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশে নেওয়া হলে কোম্পানিগুলোর বাজারে আসার আগ্রহ বাড়বে। একই সঙ্গে করমুক্ত বা স্বল্পকর লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারমুখী করতে পারে। বাজারে বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ যত বাড়বে, বাজারের গভীরতাও তত বাড়বে।
পাশাপাশি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। ডিজিটাল আর্থিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। ভালো কোম্পানি বাজারে আসার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, যাতে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমে। শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না। এ ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, যাতে তারা নিজস্বভাবে বাজার তদারকি ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষা জোরদার করতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংস্কার। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কার্যকারিতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। আন্তসংস্থা সমন্বয় জোরদার করা এবং আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানোও সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে, যাতে বাজারে তারল্য বাড়ে।
দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের টেকসই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ভিত্তি তৈরির ওপর। এ ক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। এই ব্যবধান কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক নীতিসহায়তা প্রয়োজন। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে কর রেয়াত বাড়ানো, নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয় করমুক্ত করা এবং আইপিওতে মিউচুয়াল ফান্ডের কোটা বাড়ানো হলে খাতটি সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের বিনিয়োগের ওপর বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হলে প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি বাজারে আসবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে। সঠিক সংস্কার, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এই বাজারই হতে পারে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি।