প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি বোর্ডে’ যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার নয়টি দেশ। বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তান, মিশর, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এই বোর্ডে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের কথা জানান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গাজা ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছেন। তারা মনে করেন, এই শান্তি বোর্ড একটি বহুপাক্ষিক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শান্তি বোর্ডের লক্ষ্য শুধু সংঘাত থামানো নয়; বরং একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করা, যার সুফল ভোগ করবে শুধু ফিলিস্তিনি জনগণই নয়, বরং পুরো অঞ্চলটির দেশ ও জনগণ। এতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা কাটিয়ে ওঠার একটি বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হলো, গাজা সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নতুন এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাচ্ছে। বিশেষ করে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ বোর্ডটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে জানিয়েছে, তারা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঠানো শান্তি বোর্ডে যোগদানের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে এবং এ উদ্যোগকে তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।
হোয়াইট হাউস মাত্র কয়েকদিন আগেই শান্তি বোর্ডের কাঠামো উন্মোচন করে। এই বোর্ডটি গাজায় ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধে ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওই পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতি, বন্দিবিনিময়, মানবিক সহায়তা জোরদার, গাজার পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতে একটি কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, শান্তি বোর্ড মূলত একটি সমন্বয়কারী ও তদারকি সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হচ্ছে, মানবিক সহায়তা ঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সহায়তা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এসব বিষয় নজরদারিতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, বহুপাক্ষিক এই বোর্ডে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হবে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গভীর সংশয়ও রয়েছে। গাজার অনেক বাসিন্দা ও ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই প্রক্রিয়া বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষ হবে। অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া বহু উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য দাবিগুলো পূরণ হয়নি।
বিশেষ করে ট্রাম্পের শান্তি বোর্ডে কয়েকজন কট্টর ইসরাইলপন্থী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের আশঙ্কা, এতে বোর্ডের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এবং ফিলিস্তিনিদের আস্থা অর্জন কঠিন হয়ে উঠবে।
গাজার বাসিন্দা আবু রমজি আল-সানদাউই আল জাজিরাকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহুর ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু একজন যুদ্ধবাজ নেতা, যার নেতৃত্বে ইসরাইল গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘নেতানিয়াহু আমাদের পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করেছেন।’ এমন অবস্থায় তাকে শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখাকে অনেক গাজাবাসী মেনে নিতে পারছেন না।
বাস্তবতা হলো, গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক। গত অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় গাজায় অন্তত ৪৬৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে। এসব ঘটনায় যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও বাস্তবে সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি।
এমন প্রেক্ষাপটে শান্তি বোর্ডের সফলতা নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। প্রথমত, বোর্ডটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং সব পক্ষের উদ্বেগ ও দাবিকে সমান গুরুত্ব দেবে কি না। দ্বিতীয়ত, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি পক্ষ উভয়ই বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ মেনে চলবে কি না। তৃতীয়ত, গাজার পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থ ও সহায়তা সময়মতো ও স্বচ্ছভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে কি না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের অংশগ্রহণ বোর্ডটিকে মুসলিম বিশ্বের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে মিশর ও জর্ডানের মতো দেশ, যারা ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিন সংকটে মধ্যস্থতার ভূমিকা রেখেছে, তাদের সম্পৃক্ততা বাস্তব সমাধানের পথ খুঁজতে সহায়ক হতে পারে।
তবে আশঙ্কাও রয়েছে। যদি এই শান্তি বোর্ড বাস্তবে গাজায় সহিংসতা কমাতে ব্যর্থ হয় বা ফিলিস্তিনিদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে অগ্রগতি না দেখাতে পারে, তাহলে এটি আরেকটি ব্যর্থ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ হিসেবে ইতিহাসে যুক্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অঞ্চলের মানুষের হতাশা আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে, গাজায় ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি বোর্ডে নয়টি দেশের যোগদান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি বাস্তব প্রয়োগ ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নও সামনে আনছে। এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করবে নাকি নতুন বিতর্ক ও হতাশা জন্ম দেবে—তার উত্তর নির্ভর করবে আসন্ন দিনগুলোতে বোর্ডের কার্যক্রম ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।