কৃষিতে ঋণপ্রবাহে গতি, ছয় মাসে বিতরণ বেড়েছে ২৯ শতাংশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
কৃষিতে ঋণপ্রবাহে গতি, ছয় মাসে বিতরণ বেড়েছে ২৯ শতাংশ

প্রকাশ: ২৬  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ব্যাংকগুলো কৃষি খাতে মোট ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চার হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা বা প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। অর্থবছরের শুরুতেই ঋণ বিতরণে এই গতি দেশের খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষকের আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য কৃষি খাতে মোট ৩৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রথম ছয় মাসেই এর মধ্যে ৫৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ সম্পন্ন হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটাই সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সাধারণত অর্থবছরের শুরুতে ঋণ বিতরণের গতি তুলনামূলক কম থাকে, সে তুলনায় এবছর প্রথমার্ধেই অর্ধেকের বেশি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া ব্যতিক্রমী বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর মোট নিট ঋণ প্রদানের অন্তত আড়াই শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণ করতে হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে এক বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। একই সঙ্গে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি খাতে নিয়োজিত। এই বাস্তবতায় নিট ঋণের মাত্র আড়াই শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দ বর্তমান চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ঋণ বিতরণের পাশাপাশি কৃষি খাতে ঋণ আদায়েও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কৃষি খাত থেকে ২১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকার ঋণ আদায় হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আদায় বেড়েছে দুই হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা বা প্রায় ১৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। এর ফলে গত ডিসেম্বর শেষে কৃষি খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ বিতরণ ও আদায়ের এই যুগপৎ প্রবৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতে কৃষিঋণের ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত দেয়। একসময় কৃষিঋণকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে সময়মতো আদায় বাড়ায় ব্যাংকগুলোর আগ্রহও বাড়ছে। এতে করে কৃষকদের জন্য আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মহাজনি ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে ঋণ সীমিত থাকার কারণে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে। আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ, উন্নতমানের বীজ ব্যবহার, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা না থাকায় অনেক কৃষক এসব প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারছেন না। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য অর্জন আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সার, বীজ, জ্বালানি ও শ্রমের খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা, বন্যা ও লবণাক্ততার ঝুঁকিও বেড়েছে। এসব পরিস্থিতিতে কৃষকদের টিকে থাকার জন্য সহজ শর্তে এবং সময়মতো ঋণ পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, কৃষি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলে কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়; এটি একটি সমন্বিত জাতীয় অগ্রাধিকার। নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কৃষি ও কৃষকের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃত কৃষকের হাতে ঋণ পৌঁছে দিতে প্রকাশ্য ও দলগত ঋণ বিতরণ কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, শুধু ব্যাংকের শাখার মাধ্যমে নয়, এজেন্ট ব্যাংকিং, সাব-ব্রাঞ্চ, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং এরিয়া অ্যাপ্রোচ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এমএফআই-লিংকেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ বিতরণও বাড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরাও সহজে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসতে পারছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিঋণ বৃদ্ধির এই ধারা ধরে রাখতে হলে শুধু পরিমাণ নয়, ঋণের গুণগত মানের দিকেও নজর দিতে হবে। সময়মতো ঋণ ছাড়, সহজ শর্ত, কম সুদ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা গেলে কৃষকের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ সেবা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ঋণের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের ইতিবাচক চিত্র দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে কৃষির প্রকৃত সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা পুনর্বিবেচনা, ব্যাংকগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এবং কৃষিবান্ধব নীতিনির্ধারণের বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত