বাহুবল নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণই ইসলামে প্রকৃত বীরত্ব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯৮ বার
বাহুবল নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণই ইসলামে প্রকৃত বীরত্ব

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শক্তি ও বীরত্বের ধারণা প্রায় সব যুগেই বাহ্যিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। যে ব্যক্তি শারীরিকভাবে প্রবল, যুদ্ধে পারদর্শী কিংবা প্রতিপক্ষকে দমন করতে সক্ষম—সমাজ সাধারণত তাকেই বীর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কুস্তির ময়দান হোক বা যুদ্ধক্ষেত্র, কিংবা আধুনিক যুগে ক্ষমতার রাজনীতি—জয়ী হওয়াই যেন বীরত্বের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই প্রচলিত ধারণার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট। কারণ বাহ্যিক শক্তি মানুষকে বড়জোর অন্যের ওপর কর্তৃত্ব করতে শেখায়, কিন্তু নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে জয় করার শিক্ষা দেয় না।

ইসলাম এসে এই চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। ইসলাম মানুষের দৃষ্টি বাহিরের শক্তি থেকে ভেতরের শক্তির দিকে ফিরিয়ে দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু বাইরের কেউ নয়; বরং তার নিজের নফস, ক্রোধ, অহংকার ও লাগামহীন আবেগ। মানুষ যখন রাগের বশবর্তী হয়, তখন সে ভালো-মন্দের পার্থক্য ভুলে যায়, সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হয়, সম্পর্ক নষ্ট করে এবং অনেক সময় এমন গুনাহে জড়িয়ে পড়ে, যার পরিণতি তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। তাই ইসলামে প্রকৃত বীরত্বের সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সংযমের মাধ্যমে।

এই সত্যটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ একটি হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়; বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)। এই হাদিসটি ইসলামের নৈতিক দর্শনের এক অনন্য ঘোষণা, যা মানুষের শক্তি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

আরব সমাজে কুস্তি, যুদ্ধ ও শারীরিক সক্ষমতাই ছিল বীরত্বের প্রধান মাপকাঠি। এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা.) ঘোষণা করলেন, প্রকৃত শক্তিমান সে নয়, যে অন্যকে মাটিতে ফেলে দিতে পারে; বরং সে-ই প্রকৃত শক্তিমান, যে নিজের রাগকে সংযত রাখতে পারে। এই বক্তব্য শুধু একটি নৈতিক উপদেশ নয়; বরং এটি মানব চরিত্র গঠনের একটি মৌলিক দিকনির্দেশনা। কারণ রাগ এমন এক আবেগ, যা মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং তাকে অন্যায় পথে ঠেলে দেয়।

ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, রাগ দমন করা আত্মসংযমের সর্বোচ্চ স্তর। তাঁর মতে, মানুষ যখন রাগান্বিত হয়, তখন তার ভেতরের পশ্চাৎপ্রবৃত্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সে সহজেই অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেই মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা মানে নিজের নফসের ওপর বিজয় অর্জন করা। একইভাবে ইবনে হাজর আল-আসকালানী (রহ.) বলেন, রাগের সময় যখন একজন মানুষের প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা থাকে, তবুও সে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে সংযত রাখে—তাহলেই সেটি প্রকৃত বীরত্ব হিসেবে গণ্য হয়।

ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন-এ রাগকে মানব চরিত্রের ভারসাম্য নষ্টকারী এক ভয়ংকর উপাদান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, রাগ মানুষের চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং শয়তান এই অবস্থাকেই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগায়। তাই রাগ দমন করা মানে কেবল নিজের চরিত্র রক্ষা করা নয়, বরং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, আত্মনিয়ন্ত্রণ এক ধরনের ইবাদত, যা মানুষের ভেতরের জগতকে পরিশুদ্ধ করে।

পবিত্র কোরআনুল কারিমেও এই গুণের প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তারা নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল হয়।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)। এই আয়াতে রাগ দমন ও ক্ষমাশীলতাকে মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়, তারা রাগের বশবর্তী হয় না; বরং ক্ষমার পথে হাঁটে।

ইসলামের এই শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব স্তরেই গভীর প্রভাব ফেলে। একজন ব্যক্তি যদি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, তবে তার পারিবারিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং সমাজে সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে, লাগামহীন রাগ ব্যক্তি ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ইতিহাসে অসংখ্য সংঘাত, যুদ্ধ ও রক্তপাতের মূলেও এই নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ কাজ করেছে।

ইসলামে বীরত্ব মানে দাপট দেখানো নয়, বরং দায়িত্বশীল সংযম; আক্রমণ নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণ; প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমা। যে ব্যক্তি রাগের মুহূর্তে নিজের নফসকে পরাস্ত করতে পারে, সে-ই আল্লাহর কাছে সত্যিকার অর্থে শক্তিমান ও মর্যাদাবান। এই শিক্ষা আজকের অস্থির ও সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যেখানে সামান্য মতভেদ থেকেই বড় সংঘর্ষের জন্ম হয়, সেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণই হতে পারে শান্তির প্রধান চাবিকাঠি।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত বীরত্ব কোনো বাহ্যিক শক্তির প্রদর্শনী নয়; বরং এটি এক অন্তর্গত সংগ্রাম, যেখানে মানুষ নিজের দুর্বলতা, রাগ ও অহংকারকে জয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অগ্রসর হয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার, রাগ সংবরণ করার এবং নববী আদর্শের আলোকে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com