প্রকাশিত: ১৫ই জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের ৪২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় দিনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে আজ। ব্রিটিশ শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক এফটিএসই ১০০ প্রথমবারের মতো ৯,০০০ পয়েন্টের ঐতিহাসিক বাধা অতিক্রম করে নতুন রেকর্ড গড়েছে। সকাল ৮টায় লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকেই ঊর্ধ্বগতিতে থাকা সূচকটি দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ৯,০১২.৪৭ পয়েন্টে পৌঁছে ইতিহাস সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকরা এই অসাধারণ অর্জনের পেছনে পাঁচটি মুখ্য কারণ চিহ্নিত করেছেন:
প্রথমত, ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের গত সপ্তাহে সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। দ্বিতীয়ত, গত প্রান্তিকে যুক্তরাজ্যের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৮% হওয়ায় মন্দার আশঙ্কা দূর হয়েছে। তৃতীয়ত, পাউন্ড স্টার্লিংয়ের দরপতনের ফলে ব্রিটিশ রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বেড়েছে। চতুর্থত, ব্যাংকিং ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যাপক চাহিদা সূচককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পঞ্চমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির আশায় বিনিয়োগকারীদের মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাতওয়ারি পারফরম্যান্স:
ব্যাংকিং খাত: এইচএসবিসি (+৬.২%), বার্কলেজ (+৫.৮%), লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপ (+৫.৩%)
প্রতিরক্ষা খাত: বিএই সিস্টেমস (+৭.১%), রোলস রয়েস (+৪.৯%)
জ্বালানি খাত: BP (+৩.২%), শেল (+২.৯%)
ফার্মাসিউটিক্যালস: GSK (+৩.৫%), অ্যাস্ট্রাজেনেকা (+২.৭%)
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. অলিভিয়া হ্যারিসন বলেন, “এটি কেবল একটি সংখ্যাগত রেকর্ড নয়, বরং ব্রিটিশ অর্থনীতির প্রতি বিশ্ব বিনিয়োগ সম্প্রদায়ের ভোট অব কনফিডেন্স।” তিনি আরও যোগ করেন, “ব্রেক্সিট পরবর্তী অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি এখন নতুন গতিশীলতা পেয়েছে।”
অন্যদিকে, লন্ডন বিজনেস স্কুলের ফিন্যান্স অধ্যাপক ড. রিচার্ড এলিস সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “একদিনের রেকর্ডকে পুরোপুরি উৎসাহের সঙ্গে নেওয়া উচিত নয়। মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্থরতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।”
অর্থমন্ত্রী অ্যালিসন ওয়াটসন এই সাফল্যকে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি টুইটারে লিখেছেন, “এফটিএসই ১০০-এর এই রেকর্ড আমাদের অর্থনৈতিক কৌশলের সঠিকতারই প্রমাণ। আমরা একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলছি।”
বিপক্ষ লেবার পার্টির অর্থনৈতিক বিষয়ক মুখপাত্র জন রিড যদিও বলেন, “এই সাফল্য সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবে কিনা, সেটাই আসল প্রশ্ন। কর্পোরেট লাভ বাড়লেও সাধারণ নাগরিকদের আয় stagnated রয়েছে।”
লন্ডনের এক খুচরা বিনিয়োগকারী মাইকেল টম্পসন বলেন, “আমি গত ১৫ বছর ধরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছি। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট, ব্রেক্সিট এবং কোভিড-১৯ এর পর এই রেকর্ড সত্যিই অভূতপূর্ব।”
এই রেকর্ডের মধ্যেই যুক্তরাজ্যের শেয়ারবাজার এখন বিশ্বের সেরা পারফর্মিং বাজারের তালিকায় উঠে এসেছে। এফটিএসই ১০০ সূচক এবছর ১৪.৬% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জার্মানির ড্যাক্স (১০.২%) এবং ফ্রান্সের সিএসি ৪০ (৯.৮%)কে পেছনে ফেলেছে। তবে এখনও এটি আমেরিকার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ (১৮.৩%) এবং নাসড্যাক (২০.১%) এর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা এখন দেখছেন এই ঊর্ধ্বগতি টেকসই হবে কিনা। মর্গান স্ট্যানলির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আমরা আশা করছি এফটিএসই ১০০ এই বছর ৯,৫০০ পয়েন্ট ছুঁতে পারে, যদি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকে।”
এফটিএসই ১০০-এর এই রেকর্ড ব্রেকিং মুহূর্ত নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য একটি মাইলফলক। তবে এই গতি ধরে রাখতে সরকারি নীতিনির্ধারক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং কর্পোরেট নেতৃত্বকে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আগামী দিনগুলোতে এই অর্জন টেকসই হয় কিনা, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।