প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের প্রভাব এখনও ভেঙে পড়েনি, এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এই বিষয়টিকে আবারও আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে এনেছে। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আইএসের ৩০টিরও বেশি ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলা বিভিন্ন অভিযানের ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয় এবং সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্যে জানানো হয়েছে যে এগুলো আইএসের অবকাঠামো, অস্ত্রভান্ডার, যোগাযোগ কেন্দ্র এবং নেতৃত্বশক্তি দমনকেন্দ্রিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সূত্র বলছে, এই অভিযানগুলোর মধ্যে ১০টি পৃথক আক্রমণ অন্তর্ভুক্ত, যা মূলত গত বছরের ডিসেম্বরে আইএসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় পরিচালিত হয়েছে। ওই হামলায় আইওয়া ন্যাশনাল গার্ডের দুই রিজার্ভ সদস্য নিহত হন এবং তাদের সঙ্গে থাকা একজন দোভাষীর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর তিন সদস্য আহত হন। এই ঘটনার পরে ‘অপারেশন হকআই স্ট্রাইক’ শিরোনামে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম ধারাবাহিকভাবে আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছে।
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা আইএসের অবকাঠামো, অস্ত্রভান্ডার, সরাসরি এবং পরোক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছি। হামলায় ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে তাদের নেতৃত্বশক্তি এবং তৎপরতা দুর্বল করা যায়।” এছাড়া জানানো হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতেও আলকায়েদা-সংশ্লিষ্ট এক যোদ্ধা বিলাল হাসান আল-জামিসকে হত্যার মাধ্যমে আইএসের প্রভাব কমানোর প্রচেষ্টা করা হয়েছে।
অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার, সেন্টকমের কমান্ডার, জানান, “যারা নিজেদের নাগরিক বা সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলা চালাবে বা ষড়যন্ত্রে যুক্ত হবে, তাদের জন্য কোথাও নিরাপদ আশ্রয় থাকবে না। এই অভিযানের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস মোকাবেলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
এছাড়া ২৭ জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধ পর্যন্ত আইএসের অস্ত্রভান্ডার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাঁচটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্র আইএসের শতাধিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে এবং এসব অভিযানে অন্তত ৫০ আইএস যোদ্ধা নিহত বা আটক হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই অভিযানগুলোতে আইএসের অভ্যন্তরীণ সংগঠন, সরবরাহ চেইন এবং নেতৃত্বশক্তি কার্যত ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিরিয়ায় আইএস এখনও ক্ষুদ্র আকারে সক্রিয়, তবে তাদের শক্তি সীমিত এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অভিযানের কারণে তারা দীর্ঘমেয়াদি বড় আক্রমণ চালাতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপ মূলত প্রতিরোধক এবং প্রতিশোধমূলক। এতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সিরিয়ার স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ধরণের অভিযান শুধু তাত্ক্ষণিক আঘাত নয়, বরং আইএসের পুনর্গঠন ক্ষমতাকেও ব্যাহত করে। হামলার মাধ্যমে তাদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি এবং কার্যক্রম আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন প্রচেষ্টায় জোরদার বার্তা হিসেবে কাজ করছে।
আইএসের অবকাঠামোর উপর এই অভিযান নিঃসন্দেহে অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাস দমন নিশ্চিত করতে সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অপরিহার্য। তবে উল্লেখযোগ্য হলো, মানবিক দিক থেকেও এই ধরনের অভিযান সচেতনতার দাবি রাখে, যাতে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতি বা পরিস্থিতি আরও জটিল না হয়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়ায় আইএস এখনও শক্তিশালী হলেও তাদের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য কমতি লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপ তাদের পুনর্গঠন ক্ষমতাকে সীমিত করেছে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় এই অভিযানগুলোতে ধারাবাহিক নজরদারি এবং তদারকি চালানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে।