ইরানি নাবিকদের এক মাসের ফ্রি ভিসা দেবে শ্রীলঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৫০ বার
ইরানি নাবিকদের এক মাসের ফ্রি ভিসা দেবে শ্রীলঙ্কা

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারত মহাসাগরের জলসীমায় সাম্প্রতিক এক সামরিক ও মানবিক সংকটের ঘটনায় নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে শ্রীলঙ্কা। দুর্ঘটনা ও সংঘাতের পর সমুদ্রে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া ইরানি নাবিকদের মানবিক সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে দেশটি। শ্রীলঙ্কা সরকার জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ইরানি নাবিকদের জন্য এক মাসের বিনামূল্যে ভিসা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নিরাপদে সাময়িকভাবে দেশটিতে থাকতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পান।

দেশটির জননিরাপত্তা মন্ত্রী জানিয়েছেন, এই বিশেষ ভিসা সুবিধা মূলত উদ্ধার হওয়া নাবিকদের অস্থায়ী আশ্রয় নিশ্চিত করার জন্য দেওয়া হচ্ছে। কারণ দুর্ঘটনার পর অনেক নাবিকের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে তাদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে শ্রীলঙ্কা সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ইরানের যুদ্ধজাহাজ IRIS Bushehr থেকে মোট ২০৪ জন নাবিককে নিরাপদে শ্রীলঙ্কার একটি নৌঘাঁটিতে নিয়ে আসা হয়েছে। জাহাজটিতে হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটি সমুদ্রে চলাচলে সমস্যায় পড়ে এবং জরুরি সহায়তার জন্য শ্রীলঙ্কার কাছে বার্তা পাঠায়। এরপর দ্রুত পদক্ষেপ নেয় শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনী। উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে তারা নাবিকদের নিরাপদে উপকূলে নিয়ে আসে।

উদ্ধার হওয়া এসব নাবিক বর্তমানে শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। তাদের জন্য অস্থায়ী আবাসন, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানি দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নাবিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে প্রশাসনের ধারণা, পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। সেই কারণেই এক মাসের বিনামূল্যের ভিসা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনার পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি সামুদ্রিক ট্র্যাজেডি। কয়েক দিন আগে শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রে সংঘটিত এক হামলায় ডুবে যায় ইরানের আরেকটি যুদ্ধজাহাজ IRIS Dena। বুধবারের ওই ঘটনায় একটি মার্কিন সাবমেরিন থেকে নিক্ষিপ্ত টর্পেডোর আঘাতে জাহাজটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরে ডুবে যায় বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এই ঘটনার ফলে বিপুলসংখ্যক নাবিক হতাহত হন। প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় ৮০ জনের বেশি নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যাপক অনুসন্ধান অভিযান চালায়। তারা সমুদ্র থেকে কয়েকজন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় এবং অনেক মরদেহও উদ্ধার করা হয়।

শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৩২ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় সমুদ্রের প্রতিকূল আবহাওয়া ও ঢেউয়ের কারণে কাজটি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবু উদ্ধারকারী দল দিনরাত কাজ চালিয়ে যায়, যাতে যত বেশি সম্ভব নাবিককে খুঁজে বের করা যায়।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটল। তাই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ঘটনার ফলে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

তবে শ্রীলঙ্কা সরকার এই সংকটের মাঝেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, উদ্ধার হওয়া নাবিকরা প্রথমত মানুষ, তাই তাদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। তাদের অস্থায়ী আশ্রয় দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক দায়িত্বের অংশ বলেও উল্লেখ করেছেন তারা।

এই সিদ্ধান্তের ফলে ইরানি নাবিকদের জন্য শ্রীলঙ্কায় অন্তত সাময়িক স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যুদ্ধজাহাজে থাকা অবস্থায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও হামলার অভিজ্ঞতার পর তাদের অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে তাদের সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য সময় ও সহায়তা প্রয়োজন।

ইরান সরকারের পক্ষ থেকেও শ্রীলঙ্কার এই মানবিক উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, উদ্ধার হওয়া নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের নিজ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।

ভারত মহাসাগর অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক পথ হওয়ায় এখানে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর উপস্থিতি নিয়মিত দেখা যায়। সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো সেই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকেই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরানি নাবিকদের উদ্ধার ও তাদের জন্য বিশেষ ভিসা সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত শ্রীলঙ্কার মানবিক ও কূটনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। দুর্ঘটনা ও সংঘাতের এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও মানবিক সহমর্মিতার যে দৃষ্টান্ত দেশটি দেখিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

এখন নজর রয়েছে উদ্ধার হওয়া নাবিকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের দিকে। তাদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা সরকার সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলেই জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত