যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ: দৈনিক ব্যয় শত কোটি ডলার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৬৮ বার
যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধ ব্যয়

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত ও জটিল আকার ধারণ করছে। সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি কূটনৈতিক উত্তেজনা, মানবিক সংকট এবং বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়ের কারণে এই যুদ্ধ এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের বর্তমান গতিপ্রকৃতি অব্যাহত থাকলে এটি শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ প্রতিদিনের এই ব্যয়ের ভার বহন করছেন মূলত মার্কিন করদাতারা। ইতোমধ্যে মাত্র নয় দিনের লড়াইয়ে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে এক হাজার সাতশোরও বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এতে যুদ্ধের মানবিক মূল্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিবেদক ন্যান্সি ইউসুফ এক মার্কিন কংগ্রেস কর্মকর্তার বরাতে জানান, পেন্টাগনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। সামরিক অভিযান, যুদ্ধবিমান পরিচালনা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন এবং লজিস্টিক সহায়তার মতো বিভিন্ন খাতে এই ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

এর আগে তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থার এক বিশ্লেষণে বলা হয়, যুদ্ধের প্রথম চার দিনেই ইরানের পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম হারিয়েছে। এতে যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও প্রকাশ পাচ্ছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক ব্রিফিংয়ে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে চলমান সংঘাত অন্তত আট সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রতিদিনের গড় ব্যয়ের হিসাবে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ছাপ্পান্ন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই ব্যয় আরও অনেক বেশি হতে পারে।

মার্কিন রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত যদি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে তবে যুদ্ধের সময়কাল দুই শতাধিক দিনে পৌঁছাতে পারে। তখন পেন্টাগনের ব্যয় দুই শত পনেরো বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ কেন্ট স্মেটার্সও সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঘাটতি এবং বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে অতিরিক্ত একশ বিলিয়নেরও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি ধারণা দিয়েছেন। তার মতে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয় মিলিয়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ দুই শত বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

সামরিক প্রস্তুতির ব্যয়ও ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পেন্টাগনের সাবেক বাজেট কর্মকর্তা এলেইন ম্যাককাস্কার জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর আগেই মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক যুদ্ধজাহাজ ও শতাধিক যুদ্ধবিমান পুনঃমোতায়েন করতে গিয়ে প্রায় ছয় শত ত্রিশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।

যুদ্ধের এই বিপুল ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন একই সময়ে দেশের ভেতরে বিভিন্ন সামাজিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন সরকারি সেবায় কাটছাঁটের সিদ্ধান্তের কারণে অনেক নাগরিক ইতোমধ্যে চাপের মুখে পড়েছেন। ফলে যুদ্ধ ব্যয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

এদিকে সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ জানিয়েছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে নতুন নেতাকে নির্বাচিত করেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো তার নাম ঘোষণা করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে থাকেন। তাই নতুন নেতা নির্বাচনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, তার অনুমোদন ছাড়া ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবেন না। তিনি ইরানের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে তেহরানকে ওয়াশিংটনের অবস্থান বিবেচনায় নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন।

অন্যদিকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীও সতর্ক করেছে যে খামেনির স্থলাভিষিক্ত যে কেউ হলে তাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তারা জানিয়েছে, নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার যে কোনো প্রচেষ্টা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা কঠোর অবস্থান দেখা গেছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা সচিব আলি লারিজানি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে সরাসরি দায়ী করে বলেছেন, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ভুল আন্তর্জাতিক হিসাব-নিকাশের ফল। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে কৌশলগত অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর জানিয়েছে, বর্তমান গতির যুদ্ধ অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তারা দাবি করেছে, দেশের সামরিক বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের মাটি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, ইরান শত্রুকে এক ইঞ্চি জমিও দখল করতে দেবে না।

এদিকে যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। ইসরাইলের কয়েকটি শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতেও হামলার দাবি করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী।

মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি ঘটছে। লেবাননে ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা প্রায় চার শতের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে বহু শিশু রয়েছে। এছাড়া হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে।

সংঘাতের কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহে পাঁচ লাখেরও বেশি লেবানিজ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে গেছে। তাদের আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সরকার।

এই অস্থিরতার মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোও সতর্কতা অবলম্বন করছে। ইতালি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ইতোমধ্যে তাদের প্রায় বিশ হাজার নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যদি দ্রুত বন্ধ না হয়, তবে এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ছাপ ফেলতে পারে। যুদ্ধের প্রতিটি দিন শুধু নতুন প্রাণহানি নয়, বরং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির বোঝাও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত