হরমুজ প্রণালীর কাছে তিন কার্গো জাহাজে হামলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬
  • ৩৫ বার
হরমুজ প্রণালী জাহাজ হামলা সংকট

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীর কাছে পরপর তিনটি কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বুধবার সকালে পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এখনো পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, কারা এই হামলাগুলো চালিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সামুদ্রিক নৌ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ব্রিটিশ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এ বিষয়ে প্রথম সতর্কবার্তা দেয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি পৃথক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলার ঘটনাস্থল হরমুজ প্রণালীর আশপাশের জলসীমা।

সর্বশেষ হামলার ঘটনাটি ঘটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই উপকূল থেকে প্রায় ৫০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই জাহাজটি অজ্ঞাত হামলার শিকার হলেও জাহাজে থাকা নাবিকেরা নিরাপদে আছেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, জাহাজটির বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং সেটি নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের উত্তরে আরেকটি কার্গো জাহাজ হামলার মুখে পড়ে। ঘটনাস্থলটি উপদ্বীপের প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল উত্তরে অবস্থিত। হামলার পর ওই জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকলে জাহাজের পক্ষ থেকে জরুরি সহায়তা চেয়ে সংকেত পাঠানো হয়। পরে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

এদিকে ভোরের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের কাছাকাছি আরেকটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনাটিকে অনেকেই হামলার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছেন। সব মিলিয়ে বুধবারের ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও অস্থির করে তুলেছে।

ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যদিও সব ঘটনার দায় এখনো কেউ স্বীকার করেনি, তবুও এই ধারাবাহিক হামলা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পৌঁছানোর জন্য এই প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চলে যে কোনো অস্থিরতা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।

বর্তমান উত্তেজনার পেছনে রয়েছে ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা। ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের পর অঞ্চলটির পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। এর পরপরই ইরানি সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং কার্যত সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।

ইরান জানিয়েছে, চীন ও রাশিয়ার জাহাজ ছাড়া বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জাহাজের জন্য এই পথ দিয়ে চলাচল সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে। এর ফলে ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং তেলের দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য ঘিরেও নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্রের নিচে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও এই কার্যক্রম এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত কয়েক দিনে মাত্র কয়েক ডজন মাইন স্থাপন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই খবর সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কঠোর বার্তা দেন। তিনি বলেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপন করে থাকে, তবে তা অবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, যদি সত্যিই সেখানে মাইন স্থাপন করা হয়ে থাকে এবং তা অপসারণ না করা হয়, তবে ইরানকে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে একই সঙ্গে তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, তেহরান যদি দ্রুত এসব মাইন সরিয়ে নেয়, তাহলে তা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি বার্তা দেন। তিনি জানান, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপনকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। তার ভাষায়, অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এসব লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালীকে কোনোভাবেই জিম্মি হতে দেওয়া হবে না। বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে যে কোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ অচল হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক হামলাগুলো তাই শুধু কয়েকটি জাহাজের ওপর আঘাত নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতির দিকে এবং আগামী দিনগুলোতে সেখানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় তার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত