যুদ্ধের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে ঈদের আনন্দ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
মধ্যপ্রাচ্যে ঈদের আনন্দ

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল আকাশে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনের মাঝেই শুরু হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতরের উদ্‌যাপন। ভয়, অনিশ্চয়তা এবং সামরিক উত্তেজনার আবহেও ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে মানুষের ভেতরে যে অদম্য মানসিক শক্তি কাজ করে, তারই এক বিরল দৃশ্য দেখা যাচ্ছে অঞ্চলজুড়ে।

শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল থেকে সৌদি আরব-সহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে বাহরাইন, কাতার এবং কুয়েত-এও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করেন।

মসজিদে মসজিদে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় জমতে শুরু করে। সাদা পোশাকে সজ্জিত মুসল্লিরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, বিনিময় করেন ঈদের শুভেচ্ছা। এই দৃশ্য যেন একদিকে শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক, অন্যদিকে চলমান সংঘাতের মাঝেও মানবিকতার শক্তিশালী প্রকাশ।

তবে এই আনন্দঘন মুহূর্তের আড়ালেই লুকিয়ে আছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক। কারণ একই সময় অঞ্চলজুড়ে অব্যাহত রয়েছে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা। তেহরান এবং তেল আবিব-এর মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার দাবি করছে, যার ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে উঠেছে।

ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা ইসরাইলি স্থাপনায় সফল হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় লক্ষ্য করে আঘাত হানার কথা জানিয়েছে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। অপরদিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তারা তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিমান হামলা শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম CNN জানিয়েছে, ঈদের দিনেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। অনেক স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম IRIB জানায়, তেহরানের পূর্বাঞ্চলে শত্রুপক্ষের হামলা প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে সৌদি আরবও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চলে অন্তত এক ডজন ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের আল-জাওফ এলাকায় একটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানানো হয়। এই পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমা সুরক্ষায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে। ইরান থেকে আসা সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলো সক্রিয় রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বাহরাইনে একটি ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পর তার ধ্বংসাবশেষ একটি গুদামে পড়ে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। বাহরাইন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্রুত দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

অন্যদিকে কুয়েত-এও হামলার সতর্কতা সাইরেন বেজে উঠেছে। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রেখেছে। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা ঈদের আনন্দ থেকে নিজেদের দূরে রাখেননি। বিভিন্ন দেশে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী স্থানীয় মুসল্লিদের সঙ্গে ঈদের জামাতে অংশ নিয়েছেন। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকেও তারা ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করার চেষ্টা করেছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলেও ঈদের নামাজ আদায় তাদের মনে একধরনের প্রশান্তি এনে দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার একটি প্রতিফলন। রাজনৈতিক বিরোধ, সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা অঞ্চলটিকে বারবার সংঘাতের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তবে এর মাঝেও সাধারণ মানুষের জীবন থেমে থাকে না। ধর্মীয় উৎসবগুলো তাদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ও আশার আলো নিয়ে আসে।

ঈদুল ফিতর মূলত সংযম, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার বার্তা বহন করে। যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও এই উৎসব মানুষকে শান্তির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন আকাশে যুদ্ধের শব্দ, তখন মসজিদে উচ্চারিত তাকবির যেন এক ভিন্ন বার্তা দেয়—মানবতা ও শান্তির বার্তা।

এই ঈদ তাই মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং কঠিন বাস্তবতার মাঝেও আশা ধরে রাখার এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ থামুক, শান্তি ফিরে আসুক—এই প্রত্যাশাই এখন অঞ্চলজুড়ে মানুষের মুখে মুখে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত