প্রকাশ: ১৮ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পালাবদলে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ভারত, চীন ও রাশিয়ার গঠিত ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় জোট ‘আরআইসি’। কোভিড-১৯ মহামারির পর দীর্ঘদিন কার্যত স্থবির হয়ে থাকা এই জোট পুনরুজ্জীবনের পদক্ষেপে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে চীন। বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানায়, আরআইসি কেবল অংশগ্রহণকারী তিন রাষ্ট্রের স্বার্থে নয়—এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তির জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো।
রুশ বার্তা সংস্থা ইজভেস্তিয়া প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই রুদেনকো জানান, মস্কো চাইছে আবারও সক্রিয় হোক আরআইসি। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে চীন ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রুদেনকোর মতে, “এই জোটের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা গেলে তা হবে তিনটি কৌশলগত অংশীদার দেশের একটি ঐতিহাসিক কাঠামোর পূনর্গঠন।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই তিন রাষ্ট্রই একসাথে ব্রিকসের প্রতিষ্ঠাতা।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ানও রুশ বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, চীন প্রস্তুত ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় কাজ করতে। তিনি বলেন, “ত্রিপক্ষীয় এই কাঠামো বিশ্বব্যাপী শান্তি ও উন্নয়নের গতিপথে একটি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।”
আরআইসিকে ঘিরে ইতোমধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে সক্রিয়তা শুরু হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বৈঠকে যোগ দিতে চীন সফর করেন। সেখানে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন। এই সফরের আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং-ও চীন সফর করেছিলেন। ফলে পর্যায়ক্রমে ভারত-চীন সম্পর্ক কিছুটা হলেও উষ্ণ হতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ উল্লেখ করেন, “আরআইসি জোট একসময় ছিল অত্যন্ত সক্রিয়—যেখানে নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে ২০টির বেশি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, এই কাঠামোই পরবর্তীতে ব্রিকস গঠনের ভিত্তি তৈরি করে এবং ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’-এর সূচনা হয় এখান থেকেই।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামোর সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিশেষ করে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষ, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পাকিস্তান ইস্যুতে চীনের অবস্থান বরাবরই এই জোটের কার্যকারিতা সীমিত করেছে। অন্যদিকে, ভারতের কোয়াড জোটে অংশগ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রাশিয়া ও চীন উভয়ের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই সময়—আরআইসি কাঠামোকে আবার সক্রিয় করার। রাশিয়ার অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ‘ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ’-এর ইন্ডিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক লিডিয়া কুলিক মন্তব্য করেন, “ইউরেশিয়া অঞ্চলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তুলতে হলে এই জোটকে পুনরুজ্জীবিত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ। ভারত-চীন সম্পর্ক জটিল হলেও রাশিয়ার মধ্যস্থতামূলক ভূমিকা এই কাঠামোকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এই ত্রিপক্ষীয় সংলাপ ও সহযোগিতার ধারা পুনঃচালু হয়, তাহলে তা কেবল জিও-পলিটিকাল ভারসাম্য রক্ষায় নয়, বরং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার অস্থিরতাপূর্ণ অঞ্চলে একটি কার্যকর সংলাপমুখী ও বহুপাক্ষিক কাঠামো গঠনে নতুন পথ উন্মোচন করতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির নতুন ভারসাম্যে পুরনো মিত্রদের পুনর্মিলন—আরআইসি জোট কি তা-ই হতে চলেছে? এই প্রশ্ন এখন আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলে।