এমপিদের খেলাপি ঋণ ৩৩৩০ কোটি, সংসদে উদ্বেগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
সংসদ সদস্যদের খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৩৩০ কোটি

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আর্থিক খাত নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সংসদ সদস্যদের ঋণসংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান সংসদ সদস্য এবং তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা ইতোমধ্যেই খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা দেশের আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সোমবার (৬ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের নবম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এই তথ্য তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। সংসদ কক্ষে উপস্থাপিত এই তথ্য মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে এবং দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও তাদের মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে। এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ও আর্থিক শৃঙ্খলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আদালতের বিভিন্ন নির্দেশনা বা স্থগিতাদেশের কারণে খেলাপি ঋণের একটি অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনেক সময় জটিল আইনি প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন সুবিধার কারণে এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেলে তা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি। ব্যাংকগুলো যখন ঋণ আদায় করতে ব্যর্থ হয়, তখন তাদের তারল্য সংকট তৈরি হয়, যা নতুন বিনিয়োগ ও ঋণ বিতরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যখন এই খেলাপি ঋণের সঙ্গে নীতিনির্ধারক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যুক্ত থাকেন, তখন বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।

সংসদে উপস্থাপিত এই তথ্যের পর বিভিন্ন মহলে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যারা আইন প্রণয়ন ও দেশের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাদের আর্থিক আচরণও একইভাবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার আওতায় থাকা উচিত। অন্যথায় এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকার ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে এবং খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, বরং কঠোর প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এই সমস্যার সমাধানে মূল ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা উঠেছে। তারা যদি নিরপেক্ষভাবে এবং কঠোরভাবে নিয়ম প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে খেলাপি ঋণের প্রবণতা কমানো সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা, সংসদ সদস্যরা নিজেরাই একটি উদাহরণ স্থাপন করবেন। তারা যদি নিজেদের ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করেন এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, তাহলে তা দেশের অন্যান্য নাগরিকদের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে এটি ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।

সব মিলিয়ে সংসদে উপস্থাপিত এই তথ্য দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। খেলাপি ঋণের এই উচ্চ পরিমাণ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলায় সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আসন্ন দিনগুলোতে এই বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ এবং বাস্তব অগ্রগতি কেমন হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই ইস্যুতে কার্যকর ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত