প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় বহুল প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ঘোষিত এই রায়ে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মামলার অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড প্রদান করা হয়েছে, যা দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় পাঠ শুরু করেন। প্যানেলের অন্য সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আদালতকক্ষজুড়ে ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উপস্থিত ছিলেন মামলার আসামি, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টরা।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন এবং রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালত তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
অন্যদিকে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক রবিউল ইসলাম এবং সাবেক উপপরিদর্শক বিভূতিভূষণ রায়। তারা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। আদালত তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলাটি ছিল অত্যন্ত আলোচিত ও সংবেদনশীল। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং বিচার দাবি করে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। এই হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ২৪ জুন মোট ৩০ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে ৬ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করেন। একই বছরের ২৭ আগস্ট মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন নিহত আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, যার আবেগঘন সাক্ষ্য আদালতে উপস্থিত সবার মন ছুঁয়ে যায়।
এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ ও বিশদ। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় এবং ২৭ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর আদালত রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেন। এ সময়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ, ফরেনসিক রিপোর্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আদালত তার সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
মামলায় মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে ছয়জন বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন এবং বাকিরা পলাতক। পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সাবেক কর্মকর্তাও এই মামলার আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন।
রায় ঘোষণার পর নিহত আবু সাঈদের পরিবারসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পরিবারের সদস্যরা এই রায়ে আংশিক সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, এই রায় যেন দেশের বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের একটি মাইলফলক হয়ে থাকে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায় শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এটি একটি শক্ত বার্তা দেয় যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
এদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছে, দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই রায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে তারা একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং রায় দ্রুত কার্যকরের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
সামগ্রিকভাবে এই রায় দেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আবু সাঈদের মতো একজন শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তা ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।