হামের বিস্তার ঠেকাতে আইসোলেশনের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার
হামে আক্রান্ত আইসোলেশন পরামর্শ

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে সংক্রামক রোগ হাম। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই রোগ ইতোমধ্যেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্যখাতে তৈরি হয়েছে চাপ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৪৮ শিশু এবং নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৮৯ জন। এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ২১ শিশু। আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৯৯ জনে এবং সন্দেহজনক রোগীসহ মোট ভর্তি হয়েছে ৭ হাজার ৫৭৭ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ২৪১ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে হামে আক্রান্ত রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে বাড়তি রোগীর ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে। একই পরিবারের একাধিক শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে, যা রোগটির উচ্চ সংক্রামক প্রকৃতিরই প্রমাণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম এমন একটি রোগ যা খুব দ্রুত ছড়াতে পারে। একবার কোনো এলাকায় সংক্রমণ শুরু হলে তা অল্প সময়ের মধ্যেই বড় আকার ধারণ করে। রাজধানী ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ঝুঁকি আরও বেশি। শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মীর্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, ঢাকার জনসংখ্যা ধারণক্ষমতা যেখানে অনেক কম, সেখানে বাস্তবে বসবাস করছে কয়েকগুণ বেশি মানুষ। এই অতিরিক্ত জনঘনত্বের কারণে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আক্রান্তদের দ্রুত আইসোলেশনে রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, যারা হামে আক্রান্ত হলেও গুরুতর অবস্থায় নেই, তাদের হাসপাতালে না এনে নিজ নিজ বাসায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে আলাদা রেখে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া উচিত। এতে করে সংক্রমণের বিস্তার অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হামের সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা। যদি প্রাথমিক অবস্থাতেই আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখা যায়, তাহলে রোগটি আর ছড়াতে পারবে না। পাশাপাশি তিনি হামের টিকার গুরুত্বের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, টিকাই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

সরকার ইতোমধ্যে হামের বিস্তার রোধে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় একযোগে হামের টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী ৩ মে থেকে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় এই টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু টিকাদানই নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ায় সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ে। তাই জ্বর, ফুসকুড়ি বা চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত বেড, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ রোগীর চাপ বাড়তে থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় সংকট দেখা দিতে পারে।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অভিভাবকদের উচিত শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া। একই সঙ্গে আক্রান্তদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যেখানে সরকার, স্বাস্থ্যখাত এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, কিন্তু অবহেলা এবং সচেতনতার অভাবে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখা, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব—এমনটাই আশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত