গণতন্ত্রে আস্থা চাই, বললেন চিফ হুইপ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬৬ বার
গণতন্ত্রে আস্থা চাই, বললেন চিফ হুইপ

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পারস্পরিক আস্থা ও সহমতের প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম-এর বক্তব্যের মাধ্যমে। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, এটি একটি আস্থার জায়গা—যেখানে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থাকা জরুরি। তার এই মন্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

রোববার জাতীয় সংসদ ভবন-এ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল, যাদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রমে নতুন সংযোজন ঘটেছে।

চিফ হুইপ বলেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার যদি বিরোধী দলকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং বিরোধী দল যদি সরকারকে অবিশ্বাস করে, তাহলে সংসদীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তার মতে, গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত রয়েছে এই আস্থার বন্ধনের মধ্যেই।

তিনি আরও জানান, শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ করে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে অথবা প্রয়োজনে সরাসরি তার কাছে জানাতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আইনের শাসনের প্রতি সরকারের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেছেন।

চিফ হুইপ বলেন, জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব। সংসদের ভেতরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার একটি কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং এই লক্ষ্যে সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের এই লক্ষ্য অর্জনের “টুলস ও হ্যান্ডস” হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা তাদের দায়িত্ব ও গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ তুলে চিফ হুইপ বলেন, সরকার এই সংকট মোকাবিলায় বড় ধরনের ভর্তুকি প্রদান করেছে। তিনি জানান, জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে। তিনি অতীতের সরকারগুলোর সমালোচনা করে বলেন, দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ার কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই ধারা পরিবর্তন করে দেশের অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

তার বক্তব্যে সংসদীয় কার্যক্রমের সাম্প্রতিক কিছু দিকও উঠে আসে। তিনি বলেন, একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় ১৬টি অধ্যাদেশে সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বাকি ১১৭টি অধ্যাদেশ সংসদে পাস করা হয়েছে। তিনি এটিকে একটি নজিরবিহীন সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন, কারণ মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে এতগুলো বিল পাস করা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

তবে এই সাফল্যের মধ্যেও কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চিফ হুইপ অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের কিছু সদস্য সামান্য বিষয় নিয়ে ওয়াকআউট করেছেন, যা সংসদের কার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে। যদিও তিনি স্বীকার করেন, ওয়াকআউট গণতন্ত্রের একটি স্বীকৃত অংশ এবং এটি বিরোধী দলের অধিকার। তবুও তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে আরও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে বিরোধী দল।

সংসদে ভুয়া তথ্য উপস্থাপনের বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, এক সংসদ সদস্য ভুল তথ্যের ভিত্তিতে একজন কর্মীর মৃত্যুর খবর সংসদে তুলে ধরেন, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়। এই ধরনের ঘটনা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং ভবিষ্যতে তথ্য যাচাই করে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান।

চিফ হুইপ তার বক্তব্যে একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে একত্রিত করে একটি “জুলাই জাদুঘর” প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই জাদুঘরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, এটি শুধু একটি জাদুঘর হবে না, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাসের ধারক হিসেবে কাজ করবে।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি জানান। তবে এই পরিকল্পনা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে কোন ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপন করা হবে—তা নিয়ে নানা মতামত উঠে আসছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চিফ হুইপের এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। তারা বলেন, গণতন্ত্রে আস্থা ও সহমতের গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা না থাকলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই বক্তব্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বাস্তবে এই ধরনের আস্থা গড়ে তোলা কঠিন। তবে সবাই একমত যে, দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অপরিহার্য।

সবশেষে বলা যায়, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু আইন বা কাঠামো যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের প্রতি অঙ্গীকার। চিফ হুইপের বক্তব্য সেই দিকেই ইঙ্গিত করে—যেখানে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানুষ এবং তাদের কল্যাণ। এখন দেখার বিষয়, এই বক্তব্য বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয় এবং তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত