মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: মেয়েকে আনতে গিয়ে লাশ হলো মায়ের, বেঁচে গেল ছোট্ট ঝুমঝুম

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ জুলাই, ২০২৫
  • ৭১ বার
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: মেয়েকে আনতে গিয়ে লাশ হলেন মায়ের, বেঁচে গেল ছোট্ট ঝুমঝুম

প্রকাশ: ২২শে জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর উত্তরা এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারানোদের তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও একটি হৃদয়বিদারক নাম—মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রজনী খাতুন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সী এই নারী গতকাল সোমবার নিজের কন্যা ঝুমঝুম খাতুনকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান। মৃত্যুর আগেও তিনি ছিলেন একটি মায়ের পরিচয়ে—ভরসা, নির্ভরতা ও ভালোবাসার প্রতীক।

রজনী খাতুন ছিলেন গাংনীর মটমুড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং স্থানীয় বিএনপি সভাপতি আব্দুল হামিদের মেয়ে। তার স্বামী জহুরুল ইসলাম ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকায় পরিবারসহ রাজধানীর উত্তরায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তাদের একমাত্র মেয়ে ঝুমঝুম খাতুন পড়ছিল পঞ্চম শ্রেণিতে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। প্রতিদিনের মতো সোমবারও রজনী গিয়েছিলেন মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে। তবে সে যাত্রা ছিল জীবনের শেষ সফর।

সেদিন দুপুরে, যখন গোটা উত্তরায় এক গভীর আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছিল, তখন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আকাশে হঠাৎ দেখা দেয় এক ভয়াল বিভীষিকা। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কলেজের ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আগুন ও ধোঁয়া। এই প্রাণঘাতী মুহূর্তেই দুর্ঘটনার বলি হন রজনী খাতুন। অথচ যার জন্য মায়ের এই যাত্রা, সেই ঝুমঝুম অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায়।

রজনীর ছোট ভাই আশিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, তারা ঘটনার খবর পাওয়ার পরই হাসপাতালে ছুটে যান। খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, তার বোন বিমান বিধ্বস্তে গুরুতর আহত হয়েছেন। পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের সদস্যরা গভীর শোক ও বেদনায় মুহ্যমান হয়ে পড়েন।

সাধারণত যেসব দুর্ঘটনা শিরোনাম হয় তার পেছনে থাকে সংখ্যার হিসাব, মৃত ও আহতদের পরিসংখ্যান। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবার, একটি গল্প, কিছু স্বপ্ন আর অসংখ্য অশ্রু। রজনী খাতুনের মৃত্যুর ঘটনাটি তেমনই একটি নিষ্ঠুর বাস্তবতা—যেখানে একটি শিশুর চোখের সামনে থেকে মুছে গেল তার সবচেয়ে আপন মুখটি। এখন ঝুমঝুম আর কখনো স্কুল শেষে তার মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরবে না।

আজ মঙ্গলবার সকালে নিহত রজনীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে তার শ্বশুরবাড়ি কুষ্টিয়ার সাদিপুরে। জানাজা শেষে গ্রামের মানুষ চোখের জলে বিদায় জানিয়েছে এই অকালপ্রয়াত নারীকে। তাঁর মৃত্যুর খবরে গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্য গভীর শোকের। একটি মায়ের ভালোবাসা, একটি শিশুর নিরাপত্তা, আর একটি দুর্ঘটনার নির্মম পরিণতি যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কতটা ঘাটতি থেকে যায় কখনো কখনো। এই ট্র্যাজেডি কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি হয়ে উঠেছে হৃদয়ের এক গভীর ক্ষত, যেটি মুছতে সময়ের অনেক দরকার হবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইনের পক্ষ থেকে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি রজনী খাতুনের মৃত্যুতে এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। একইসাথে ছোট্ট ঝুমঝুমের জন্য রইল সহানুভূতি, সাহস ও আশীর্বাদ—এই শোকের সাগর পেরিয়ে সে যেন একদিন তার জীবনে নতুন আলো দেখতে পায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত