প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের এবারের আসরে যেন দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। ছয় ম্যাচ পার করেও জয়শূন্য থাকা দলটি ক্রমেই তলানির দিকে ডুবছে। প্রতিটি ম্যাচেই সম্ভাবনার ঝলক দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের বৃত্ত ভাঙতে পারছে না দলটি। সর্বশেষ ম্যাচেও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আহমেদাবাদের মাঠে গুজরাট টাইটান্স-এর বিপক্ষে লড়াই করেও শেষ হাসি হাসতে পারেনি কলকাতা। অধিনায়ক শুভমান গিল-এর ব্যাটিং নৈপুণ্যে ৫ উইকেটের জয় তুলে নিয়েছে গুজরাট, হাতে ছিল ২ বল।
শুক্রবারের এই ম্যাচটি ছিল দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার জন্য এটি ছিল জয়ের খোঁজে মরিয়া এক লড়াই, আর গুজরাটের জন্য ছিল পয়েন্ট টেবিলে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করার সুযোগ। তবে ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, আত্মবিশ্বাসের দিক থেকে দুই দলের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। কলকাতা যেখানে টানা ব্যর্থতায় ভুগছে, সেখানে গুজরাট ছিল ছন্দে।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা কলকাতা শুরুতেই চাপে পড়ে যায়। ওপেনিংয়ে নামা আজিঙ্কা রাহানে আবারও হতাশ করেন। ম্যাচের প্রথম বলেই আউট হয়ে গোল্ডেন ডাক মারেন তিনি, যা দলের ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। তার ব্যাটিং ফর্ম নিয়ে সমালোচনা আগেই ছিল, এই ম্যাচে সেটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। অপর প্রান্তে টিম সাইফার্ট কিছুটা চেষ্টা করলেও দীর্ঘ সময় টিকতে পারেননি। অল্প সময়ের মধ্যেই টপ অর্ডারের তিন ব্যাটার ফিরে গেলে পাওয়ার প্লে-তেই বড় ধাক্কা খায় কলকাতা।
এমন বিপর্যয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে একাই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ক্যামেরন গ্রিন। তার ব্যাট থেকে আসে দারুণ এক ইনিংস, যা না থাকলে কলকাতার স্কোর আরও অনেক কম হতে পারত। তিনি শুরু থেকেই দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেন, ধীরে ধীরে ইনিংস গড়েন এবং পরে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তার ৫৫ বলে ৭৯ রানের ইনিংসটি ছিল কলকাতার ইনিংসের মেরুদণ্ড। এই ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও ৪টি ছক্কা, যা দলকে লড়াইয়ের মতো পুঁজি এনে দেয়।
গ্রিনের সঙ্গে চতুর্থ উইকেটে কিছুটা সমর্থন দেন রোভম্যান পাওয়েল। তারা দুজন মিলে দলকে আবার ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন। পাওয়েল ২০ বলে ২৭ রান করে আউট হলেও এই জুটি কলকাতাকে কিছুটা স্থিতিশীলতা এনে দেয়। তবে মিডল অর্ডারের ব্যাটাররা আবারও ব্যর্থ হন। রিঙ্কু সিং, সুনীল নারিন ও অন্যরা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি।
শেষদিকে রমনদীপ সিং ছোট একটি ক্যামিও খেলেন, যা স্কোরকে কিছুটা এগিয়ে নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে ১৮০ রানেই অলআউট হয় কলকাতা। এই রান মোটামুটি লড়াই করার মতো হলেও গুজরাটের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে তা নিরাপদ ছিল না।
গুজরাটের বোলিং বিভাগ ছিল সুশৃঙ্খল। কাগিসো রাবাদা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে কলকাতার ব্যাটিং লাইনআপে আঘাত হানেন। এছাড়া মোহাম্মদ সিরাজ ও অশোক শর্মা দুটি করে উইকেট শিকার করেন। রশিদ খান-এর স্পিনও ছিল কার্যকর।
১৮১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে গুজরাট শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিল। ওপেনিংয়ে সাই সুদর্শন ও শুভমান গিল দ্রুত রান তুলতে থাকেন। তাদের জুটিতে মাত্র ৫ ওভারেই উঠে আসে ৫৭ রান, যা ম্যাচের গতি গুজরাটের দিকে নিয়ে যায়। সুদর্শন আউট হলেও রান তোলার গতি কমেনি।
এরপর জস বাটলার ও গিলের জুটি গুজরাটকে জয়ের খুব কাছে নিয়ে যায়। বাটলার দ্রুত ২৫ রান করে আউট হলেও তার ইনিংস দলের গতি ধরে রাখে। মিডল অর্ডারে ওয়াশিংটন সুন্দর কিছুটা অবদান রাখেন, যদিও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি।
পুরো ম্যাচে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন শুভমান গিল। তার ব্যাটিং ছিল নিখুঁত পরিকল্পনার প্রতিফলন। শুরুতে সময় নিয়ে খেলা, এরপর ধীরে ধীরে গতি বাড়ানো—সব মিলিয়ে একটি আদর্শ ইনিংস উপহার দেন তিনি। ৫০ বলে ৮৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৪টি ছক্কা। তার আউট হওয়ার সময় গুজরাট প্রায় জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
শেষদিকে রাহুল তেওয়াটিয়া ও শাহরুখ খান সহজেই জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন। ১৯.৪ ওভারে ৫ উইকেট হাতে রেখেই লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে গুজরাট।
কলকাতার বোলিংয়ে কিছুটা প্রতিরোধ দেখা গেলেও তা যথেষ্ট ছিল না। বরুণ চক্রবর্তী দুটি উইকেট নেন, আর নারিন ও অন্যরা একটি করে উইকেট শিকার করেন। তবে বড় স্কোর রক্ষা করার মতো ধারাবাহিকতা ছিল না বোলিংয়ে।
এই পরাজয়ের ফলে কলকাতার অবস্থা আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে। ছয় ম্যাচে মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে তারা পয়েন্ট টেবিলের একেবারে নিচে অবস্থান করছে। অন্যদিকে গুজরাট পাঁচ ম্যাচে তিন জয় নিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, কলকাতার সমস্যার মূল জায়গা হলো ধারাবাহিকতার অভাব। কখনো ব্যাটিং, কখনো বোলিং—দুই বিভাগই একসঙ্গে ভালো করতে পারছে না দলটি। পাশাপাশি অধিনায়কত্ব এবং দল নির্বাচনের বিষয়েও প্রশ্ন উঠছে। আজিঙ্কা রাহানের ফর্মহীনতা দলের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে গুজরাট টাইটান্স ধীরে ধীরে নিজেদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। তাদের ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগই কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে শুভমান গিলের নেতৃত্ব এবং ব্যাটিং পারফরম্যান্স দলকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।
আইপিএলের মতো প্রতিযোগিতামূলক আসরে একটি দল যদি শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে, তবে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যায়। কলকাতার ক্ষেত্রেও এখন সেই বাস্তবতা স্পষ্ট। তবে এখনো টুর্নামেন্টের অনেক ম্যাচ বাকি, তাই সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। প্রয়োজন কেবল একটি জয়, যা দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই ম্যাচটি ছিল দুই দলের ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে ছন্দে থাকা গুজরাট, অন্যদিকে ছন্দহীন কলকাতা। গিলের ব্যাটে জয় যেমন গুজরাটকে এগিয়ে দিয়েছে, তেমনি কলকাতার জন্য বাড়িয়েছে হতাশার চাপ।