প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। বহু প্রতীক্ষিত কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা আগামী সোমবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ-এ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে। এই বৈঠককে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন করে প্রত্যাশা, আবার একই সঙ্গে রয়েছে গভীর উদ্বেগও।
ইরানের একটি সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, আলোচনায় অংশ নিতে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদল রোববারই ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের সময়সূচি নিশ্চিত করেনি, তবুও মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই আলোচনাকে ঘিরে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহরে এক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, “অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতাও হয়েছে। তাই আশা করছি, খুব দ্রুত একটি ইতিবাচক ফলাফল আসতে পারে।” তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আশার সঞ্চার করলেও একই সঙ্গে তিনি একটি কঠোর সতর্কবার্তাও দিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী বুধবারের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে তিনি বর্তমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়াবেন না। এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত না হলে পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তার ভাষায়, “তাহলে হয়তো অবরোধ আরও কঠোর হবে এবং আমাদের আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে হতে পারে।” এই বক্তব্যে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য সংঘাতের ছায়াও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হরমুজ প্রণালি-কে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতবিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। ইরান সম্প্রতি শর্তসাপেক্ষে এই প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছে যে, মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা আবারও এটি বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে ইরানের নীতির ওপর নির্ভর করবে। যদি আমাদের ওপর চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে এই পথ খোলা থাকবে না।” তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন এই প্রণালির মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে এটি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনাকে শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান নাকি হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি আর বন্ধ করা হবে না। তবে এই দাবি সরাসরি নাকচ না করলেও ইরান শর্তসাপেক্ষ অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বিশ্বাসের ঘাটতি রয়ে গেছে এবং চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে আরও সময় ও আলোচনা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনার পর উভয় পক্ষ যদি একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি বড় সাফল্য হিসেবেও বিবেচিত হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আলোচনায় কয়েকটি মূল বিষয় গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামরিক উপস্থিতি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে, যা এই আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, তারা তাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত চুক্তি সহজ হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের বিকল্প খুব কম। সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উভয় পক্ষেরই সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানে এই বৈঠক তাই শুধু একটি নিয়মিত আলোচনা নয়, বরং এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সবশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া একদিকে যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি অনিশ্চয়তার ছায়াও ফেলছে। এখন সব নজর ইসলামাবাদের বৈঠকের দিকে, যেখানে সিদ্ধান্ত হবে উত্তেজনা কমবে, নাকি নতুন করে সংঘাতের দিকে এগোবে পরিস্থিতি।