প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে অস্ট্রেলিয়া এবং জাপান। প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করবে জাপান, যা দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শনিবার অনুষ্ঠিত এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস এবং জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি একটি স্মারক স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
এই চুক্তি জাপানের যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী নীতির ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৪ সালে সামরিক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর এটি জাপানের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি চুক্তি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত।
চুক্তির আওতায় জাপানের শীর্ষ প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জন্য তিনটি আধুনিক মোগামি-শ্রেণির বহুমুখী ফ্রিগেট নির্মাণ ও সরবরাহ করবে। এই জাহাজগুলো ২০২৯ সাল থেকে ধাপে ধাপে হস্তান্তর করা শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম তিনটি ফ্রিগেট জাপানে নির্মিত হবে। এরপর আরও আটটি যুদ্ধজাহাজ অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে নির্মাণ করা হবে। এই অংশটি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থের কাছে অবস্থিত হেন্ডারসন শিপইয়ার্ডে তৈরি করা হবে, যা দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধজাহাজগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হবে। এগুলো সাবমেরিন শনাক্তকরণ, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সমুদ্রপথে আক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিস্তৃত সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ রক্ষায় এই জাহাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চুক্তিটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে প্রভাব বিস্তার নিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়া তার নৌবাহিনী আধুনিকায়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। পাশাপাশি এটি অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির ভারসাম্য রক্ষায় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই তার নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল এবং ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ নিরাপদ রাখতে আধুনিক যুদ্ধজাহাজের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে সেই সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপানের জন্যও এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ধীরে ধীরে তার নীতি পরিবর্তন করছে। এই চুক্তি সেই পরিবর্তনের একটি বাস্তব উদাহরণ, যা আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে জাপানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
অন্যদিকে, এই চুক্তি অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। স্থানীয়ভাবে জাহাজ নির্মাণ শুরু হওয়ায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্প দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, ৭ বিলিয়ন ডলারের এই যুদ্ধজাহাজ চুক্তি শুধু দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নয়, বরং পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার পথ খুলে দিতে পারে।