আমেরিকায় ট্যাক্সি চালিয়ে ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়া দানবীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৮ বার
দানবীর মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম, দীর্ঘ সংগ্রাম আর সীমাহীন ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সন্তান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে কাতার এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো এই মানুষটি নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে অর্জিত আয় দিয়ে নিজ গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় গড়ে তুলেছেন ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দুটি পাঠাগার এবং একটি ডায়াবেটিক হাসপাতালের জন্য দুই কোটি টাকা মূল্যের জমি।

একজন সাধারণ শ্রমিক থেকে প্রবাসে ট্যাক্সি চালকের জীবন পেরিয়ে শিক্ষা বিস্তারের এমন মানবিক উদ্যোগ এখন এলাকাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অনেকেই তাকে “দানবীর” হিসেবে অভিহিত করছেন।

মোশাররফ হোসেনের জীবন শুরু হয়েছিল দারিদ্র্য আর সংগ্রামের মধ্যে। এসএসসি পরীক্ষার আগেই বাবাকে হারিয়ে পরিবারের ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। ছোটবেলা থেকেই সংসারের চাপ সামলাতে গিয়ে শিক্ষাজীবনে বড় বাধার মুখে পড়তে হয় তাকে। জীবিকার তাগিদে প্রথমে কাতারে পাড়ি জমান তিনি। সেখানেই শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পরিবারকে সহায়তা শুরু করেন।

কিন্তু প্রবাস জীবনের প্রতিটি দিন ছিল কঠিন সংগ্রামের। নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে শুরু করে পরবর্তীতে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুড দোকানে কাজ করেন তিনি। ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার পর শুরু হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায়। এরপর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ট্যাক্সি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় কেবল একজন ট্যাক্সি চালক নয়, বরং একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজ নির্মাতা। প্রবাসে কষ্টার্জিত আয়ের একটি বড় অংশ তিনি পাঠিয়েছেন দেশের শিক্ষার উন্নয়নে। নিজের জীবনের চাহিদাকে সীমিত রেখে তিনি গ্রামে গড়ে তুলেছেন শিক্ষা বিস্তারের এক শক্ত ভিত।

তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ, পাশাপাশি দুটি মাদরাসা এবং একটি কিন্ডারগার্টেন। এসব প্রতিষ্ঠান এখন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে।

এছাড়া তিনি দুটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা স্থানীয় শিক্ষার্থী ও পাঠকদের জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। শুধু শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য খাতেও তার অবদান রয়েছে। ডায়াবেটিক হাসপাতালের জন্য তিনি প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে জমি দান করেছেন, যা ভবিষ্যতে এলাকার মানুষের চিকিৎসা সেবায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মোশাররফ হোসেন বলেন, পড়াশোনার গুরুত্ব তিনি নিজ জীবন থেকেই উপলব্ধি করেছেন। দারিদ্র্যের কারণে নিজের পড়াশোনা বেশি দূর এগোতে না পারলেও তিনি চান না এলাকার কোনো শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে থেমে যাক। তার ভাষায়, “আমি প্রবাসে কষ্ট করেছি, কিন্তু সেই কষ্টের ফল যেন এলাকার মানুষের কাজে লাগে, সেটাই আমার জীবনের লক্ষ্য।”

তিনি আরও জানান, নিউইয়র্কে তিনি এখনো সাধারণ জীবনযাপন করেন। পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশেই থাকেন। বিলাসবহুল জীবন না বেছে তিনি মেসে থাকেন এবং সাদামাটা খাবার খেয়ে জীবন চালান, যাতে বেশি অর্থ দেশে পাঠাতে পারেন।

তার প্রতিষ্ঠিত কলেজ বর্তমানে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে শীর্ষ দশ কলেজের একটি হিসেবে স্থান পেয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করছে। উচ্চ মাধ্যমিকের পাশাপাশি স্নাতক ও মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের সুযোগ বৃদ্ধি করতে তিনি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। তার গড়ে তোলা ফাউন্ডেশন থেকে ইতোমধ্যে ২০০ শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। পাশাপাশি ১০টি গৃহহীন পরিবারকে বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, মোশাররফ হোসেনের অবদান শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার উদ্যোগে এলাকায় শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তরুণদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।

বয়স এখন ৬২ হলেও তিনি থেমে নেই। বর্তমানে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আবারও পড়াশোনা করছেন তিনি। দেশে এসে পরীক্ষায় অংশগ্রহণও করেছেন। তার বিশ্বাস, “শেখার কোনো বয়স নেই।”

জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি যেমন কষ্ট করেছেন, তেমনি সেই কষ্টকে রূপ দিয়েছেন মানবসেবায়। তার এই ব্যতিক্রমী জীবনগাথা শুধু একটি ব্যক্তিগত সফলতার গল্প নয়, বরং ত্যাগ, অধ্যবসায় ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী আজও বিশ্বাস করেন, মানুষের জন্য কাজ করাই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। তার ভাষায়, যতদিন বাঁচবেন, ততদিন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চান ব্রাহ্মণপাড়া ও আশপাশের প্রতিটি গ্রামে।

তার এই মানবিক উদ্যোগ প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছে, যা প্রমাণ করে—ইচ্ছা থাকলে দূরদেশের কঠোর শ্রমও হয়ে উঠতে পারে দেশের উন্নয়নের শক্ত ভিত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত