প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে যতই আলোচনা ও আশাবাদ বাড়ছে, বাস্তব চিত্র ততটা বিপ্লবী হয়ে ওঠেনি বলে স্বীকার করছেন শীর্ষ নির্বাহীরা। বড় বড় প্রযুক্তি ও বহুজাতিক কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের মতে, এআই এখনো কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাশিত মাত্রায় উৎপাদনশীলতার পরিবর্তন আনতে পারেনি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এই বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ চারটি দেশের প্রায় ছয় হাজার শীর্ষ নির্বাহীর মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও তার ব্যবহারিক প্রভাব সীমিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছে। তবে গড় হিসেবে একজন কর্মী সপ্তাহে মাত্র প্রায় দেড় ঘণ্টা এআই ব্যবহার করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, প্রায় এক চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের কর্মক্ষেত্রে এআই একেবারেই ব্যবহার করা হয় না।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের মতে গত তিন বছরে এআই কর্মক্ষেত্রের কাজের ধরনে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেনি। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হলেও এর কার্যকর প্রভাব এখনো খুব সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
অ্যাপোলোর প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লক এ প্রসঙ্গে বলেন, এআই বর্তমানে সর্বত্র আলোচনায় থাকলেও বাস্তব অর্থনীতিতে এর প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, জাতীয় পর্যায়ের কর্মসংস্থান বা উৎপাদনশীলতার সরকারি পরিসংখ্যানে এআইয়ের কোনো স্পষ্ট অবদান প্রতিফলিত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাইরে সাধারণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এআই থেকে উল্লেখযোগ্য আয় বা উৎপাদনশীলতার উন্নতি এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে এআই নিয়ে যে বিপ্লবের ধারণা তৈরি হয়েছে, বাস্তবে তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, এআই ব্যবহারের একটি নতুন চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের এক জরিপে দেখা গেছে, একসঙ্গে তিনটির বেশি এআই টুল ব্যবহার করলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ার বদলে উল্টো কমে যাচ্ছে। গবেষকরা এই অবস্থাকে ‘এআই ব্রেইন ফ্রাই’ নামে অভিহিত করেছেন।
অনেক কর্মী জানিয়েছেন, একাধিক এআই টুল ব্যবহারের কারণে মানসিক চাপ, বিভ্রান্তি এবং ক্লান্তি বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে ছোট ছোট ভুলের সংখ্যা বাড়ছে এবং কাজের গতি কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি সহায়তা পাওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে এটি উল্টো চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি নয়। তাঁদের মতে, নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এমন ধীরগতির গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিক। উদাহরণ হিসেবে তারা কম্পিউটারের শুরুর দিকের সময়ের কথা উল্লেখ করেন, যখন প্রযুক্তি আসলেও উৎপাদনশীলতায় বড় পরিবর্তন আসতে সময় লেগেছিল।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগলুর মতে, এআই থেকে প্রকৃত উপকার পেতে হলে আরও সময় প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, তার কার্যকর ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে এআই মূলত সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনশীলতার বিপ্লব ঘটাতে পারেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এআই ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআইয়ের সম্ভাবনা এখনো বিশাল, তবে এর বাস্তব প্রয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রে সঠিক সংহতকরণ না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
সব মিলিয়ে শীর্ষ নির্বাহীদের এই স্বীকারোক্তি বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত প্রত্যাশাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রযুক্তি নিয়ে যে বিপ্লবের আশা করা হচ্ছিল, তা বাস্তবে পৌঁছাতে এখনো অনেক পথ বাকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।