প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে বিভাগের সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী মুনিরা মেহজাবিনের আত্মহত্যার ঘটনা এবং এ ঘটনায় তার গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভাগের ২০২৪ সালের এমএ দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মুনিরা মেহজাবিনের অকাল মৃত্যুতে পুরো বিভাগ গভীর শোকের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে, যার ফলে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া বিবেচনায় বিভাগীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিশেষ একাডেমিক কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে সব ধরনের একাডেমিক দায়িত্ব, ক্লাস গ্রহণ এবং পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত রোববার ভোরে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার একটি বাসা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মুনিরা মেহজাবিন মিমোর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘিরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরবর্তীতে নিহতের বাবা বাড্ডা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ ওই দিনই বিকেলে রাজধানীর উদয়ন ম্যানশন এলাকা থেকে ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করে।
পুলিশ ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে ড. সুদীপ চক্রবর্তীর নামসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেই নোটকে কেন্দ্র করেই তদন্ত এগোচ্ছে। নোটে আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া গেছে বলেও তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। তবে এসব তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেন অনেকে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এই ধরনের সংবেদনশীল ঘটনায় শিক্ষা কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয় এবং একই সঙ্গে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছভাবে এগিয়ে যেতে পারে, সেই লক্ষ্যেই ড. সুদীপকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতের রায় অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, মুনিরা মেহজাবিনের পরিবার এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ন্যায়বিচার ছাড়া অন্য কিছু চান না এবং পুরো বিষয়টি যেন স্বচ্ছভাবে তদন্ত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংগঠনও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা মনে করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতি না ঘটে, সে জন্য আরও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সম্পর্ক, মানসিক চাপ এবং প্রশাসনিক নজরদারির বিষয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তারা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা রোধে শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পরিবেশ আরও জোরদার করা জরুরি।
বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং গ্রেফতার হওয়া শিক্ষক বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো ধরনের একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
এই ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক ধরনের শোক ও নীরবতা বিরাজ করছে। একই সঙ্গে বিষয়টি ঘিরে শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।