প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বরিশাল বিভাগে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা আবারও উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরও বহু শিশু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি চাপের মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গত একদিনে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা উভয়েই হামের জটিল উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল।
মৃত শিশুদের মধ্যে একজন হলো বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চার মাস বয়সি হুজাইফা এবং অন্যজন বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার ১৩ মাস বয়সি আব্দুল্লাহ। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উভয় শিশুই ভর্তি হওয়ার সময় থেকেই গুরুতর অবস্থায় ছিল এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। ফলে বর্তমানে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৩ জনে। শিশু রোগীদের চাপ বাড়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে হাম ও রুবেলা উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে তিন হাজার ছাড়িয়েছে। এসব রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে বা নিচ্ছে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, হামের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন উপজেলা ও জেলার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি জানান, বরিশাল বিভাগে হামের টিকার কোনো ঘাটতি নেই এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, টিকাদান কার্যক্রম চলমান থাকলেও রোগীর চাপ অনেক বেশি হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কিছুটা হিমশিম অবস্থা তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে টিকা না নিলে এবং পুষ্টিহীনতা থাকলে রোগটি মারাত্মক জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় টিকা গ্রহণে অনীহা এবং সচেতনতার অভাব সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের প্রকোপ বাড়ার পেছনে মৌসুমি পরিবর্তন, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং টিকা গ্রহণে ফাঁকও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা বলছেন, সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগই শুরুতে জ্বর, কাশি, সর্দি এবং চোখে পানি আসার মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসে। পরে অবস্থার অবনতি হলে শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীর চাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত শয্যা ও চিকিৎসক নিয়োজিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রচার কার্যক্রম বাড়ানোর ওপরও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এদিকে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় শোক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন এবং দ্রুত টিকা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে বরিশাল বিভাগে হামের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবে সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনা জনমনে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।