প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য চালু করা ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করবে। মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার এই উদ্যোগকে সরকারের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছর থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি চালু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে চলতি বছরের ১০ মার্চ এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। শুরুতেই নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা ধীরে ধীরে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারগুলো প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে। বছরে প্রতিটি পরিবার মোট ৩০ হাজার টাকা করে পাবে এই সুবিধার আওতায়। উপকারভোগীর সংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট বরাদ্দও বৃদ্ধি করা হবে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আর্থিক কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অর্থমন্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড শুধুমাত্র একটি সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি নয়, বরং এটি সরকারের মানবিক ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বাজেট থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং কোনো ঘাটতি হবে না। বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে কয়েক হাজার পরিবার এই সুবিধার আওতায় এসেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যে এই সংখ্যা ৮৬ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য প্রায় ৮৬ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এই ব্যয়ের বড় অংশ সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে, আর বাকি অংশ তথ্য সংগ্রহ, ডিজিটাল ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হবে।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, আগামী কয়েক বছরে এই কর্মসূচি ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত হবে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে, যার জন্য বাজেট ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। পরবর্তী বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়িয়ে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবার পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯–৩০ অর্থবছরে এই কর্মসূচির আওতায় মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৫৩ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে মোট ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে একটি বড় অংশ সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে ব্যয় হবে, আর বাকি অংশ জরিপ, তথ্য সংগ্রহ ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হবে।
ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এজন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি তদারকি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনকে যুক্ত করে একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা এই কর্মসূচির আওতায় আসতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের বড় সামাজিক কর্মসূচি দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে সঠিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের কর্মসূচি টেকসই রাখা কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অপচয় কমানো এবং কার্যকর লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যাতে এই ধরনের বড় প্রকল্পে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি না হয়।
সব মিলিয়ে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে পরিকল্পনার সঠিক প্রয়োগ, স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর।