এনপিটি সম্মেলনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র তীব্র বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৯ বার
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) পর্যালোচনা

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনেই তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। সম্মেলনের সহসভাপতি হিসেবে ইরানের মনোনয়ন ঘিরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রকাশ্য বাগ্‌বিতণ্ডা হয়, যা বৈশ্বিক পারমাণবিক কূটনীতির জটিল বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

১৯৭০ সালে কার্যকর হওয়া এনপিটি বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ, নিরস্ত্রীকরণ এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের মূল কাঠামো হিসেবে বিবেচিত। এই চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যালোচনার ১১তম সম্মেলন শুরু হয় সোমবার নিউইয়র্কে, যেখানে অংশ নেয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা। সম্মেলনে মোট ৩৪ জনকে সহসভাপতি মনোনীত করা হয়, যার মধ্যে ইরানও রয়েছে।

সম্মেলনের সভাপতি ও জাতিসংঘে ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত দো হুং ভিয়েত জানান, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) সদস্য দেশগুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইরানকে সহসভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরেই যুক্তরাষ্ট্র তীব্র আপত্তি তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রলিফারেশনের সহকারী সচিব ক্রিস্টোফার ইয়াও বলেন, ইরানকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এনপিটির জন্য অগ্রহণযোগ্য। তাঁর অভিযোগ, ইরান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা International Atomic Energy Agency (IAEA)-এর সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছে না এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখছে না।

তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের এই মনোনয়ন সম্মেলনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করবে এবং এটি একটি “লজ্জাজনক সিদ্ধান্ত” হিসেবে ইতিহাসে বিবেচিত হতে পারে।

এর জবাবে আইএইএ-তে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি কঠোর ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। নাজাফি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং এখনো তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়ন অব্যাহত রেখেছে।

তিনি আরও বলেন, “যে দেশ অতীতে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করেছে এবং আজও বিশ্বজুড়ে সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের পক্ষ থেকে নীতিনৈতিকতার পাঠ গ্রহণ করা গ্রহণযোগ্য নয়।”

সম্মেলনে এই বাক্যবিনিময়ের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এনপিটি ঘিরে দীর্ঘদিনের আস্থা সংকট এখনও কাটেনি। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ এবং তেহরানের পাল্টা অভিযোগ—এই দ্বন্দ্ব এখন আরও জটিল রূপ নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক উত্তেজনা কেবল এনপিটি সম্মেলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতেরও প্রতিফলন। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ পারমাণবিক ইস্যুকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা বারবার বলে আসছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত রাখাই ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য।

অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ। তেহরান আরও অভিযোগ করেছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মাধ্যমে তাদের বৈধ অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

সম্মেলনের ফাঁকে ইরানি সূত্রগুলো জানায়, যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক আলোচনায় বসতে রাজি নয় তেহরান। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে চলমান জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান না হলে কোনো নতুন আলোচনা শুরু করা হবে না বলেও জানানো হয়।

এদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং এতে কোনো পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তিনি জানান, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এনপিটি সম্মেলনে এই ধরনের উত্তেজনা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পারমাণবিক কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিতও বহন করছে।

জাতিসংঘের কূটনৈতিক মহল আশা করছে, সম্মেলনের পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে সদস্য দেশগুলো পারস্পরিক উত্তেজনা কমিয়ে একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত