বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ শিক্ষামন্ত্রীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা খাতে গত দুই দশকে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সুযোগ বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই বিস্তারের মধ্যেও শিক্ষার প্রকৃত মান, গবেষণার গুণগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। সেই বাস্তবতার কথাই এবার স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৭টিতে দাঁড়িয়েছে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও শতাধিক। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। তার এই বক্তব্য দেশের উচ্চশিক্ষা খাত নিয়ে চলমান আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শিক্ষার পরিমাণগত বিস্তারে অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু গুণগত উন্নয়নের জায়গাটি এখনও প্রশ্নের মুখে। তার ভাষায়, “আমরা কোয়ান্টিটিতে এগিয়েছি, কিন্তু কোয়ালিটি কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি, সেটি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই।” তিনি মনে করেন, এখন সময় এসেছে ‘নীড বেসিস এডুকেশন’ বা চাহিদাভিত্তিক শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষক, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সামনে তিনি আরও বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুনভাবে সাজাতে হবে। বিশ্ব এখন দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, তথ্যপ্রযুক্তি এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের যুগে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষকরা এসে পাঠদান করতেন এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরাও পড়তে আসতেন। দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় অবস্থান ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে গবেষণা, পাঠদানের পদ্ধতি এবং কারিকুলামে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে বলে মত দেন তিনি।

জাতীয় এই কর্মশালার উদ্বোধন করেন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কর্মশালার বিভিন্ন টেকনিক্যাল অধিবেশনে গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা, সফট স্কিল উন্নয়ন, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণায় উৎকর্ষ এবং শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারা। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাদের দক্ষতার বড় ধরনের ফারাক দেখা যায়। ফলে অনেক শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘসময় বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেই উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন হয় না। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা, আধুনিক ল্যাব, দক্ষ শিক্ষক এবং বাস্তবমুখী কারিকুলাম। বর্তমানে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবও শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিংয়েও বাংলাদেশের অবস্থান খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে রয়েছে। গবেষণাপত্র প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনী শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা।

শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে নতুন কারিকুলাম এবং আউটকামভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে চায়, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য না পড়ে, বরং বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল, দক্ষ এবং কর্মমুখী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষক ও গবেষকও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তাদের মতে, বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে জ্ঞান উৎপাদন, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক এবং শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

উচ্চশিক্ষা খাত নিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনা এবং শিক্ষামন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য শিক্ষাঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রকাশ্য উদ্বেগকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণে বাস্তবভিত্তিক সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত