প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যয় বিবরণী নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারণা ও সংশ্লিষ্ট খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা।
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের কাছে এই ব্যয় বিবরণী জমা দেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরিত এই প্রতিবেদনে নির্বাচনী ব্যয়ের বিস্তারিত খাতভিত্তিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশই প্রার্থীদের আর্থিক সহায়তা হিসেবে ব্যয় করা হয়েছে। দলটির মনোনীত ২২৫ জন প্রার্থীকে অনুদান বাবদ মোট ৪ কোটি টাকা প্রদান করা হয়, যা মোট ব্যয়ের সিংহভাগ।
এছাড়া প্রচারণা কার্যক্রম, জনসভা আয়োজন, নেতাদের সফর, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অন্যান্য সহায়ক কার্যক্রমেও অর্থ ব্যয় হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয় হয়েছে ২০ লাখ ৯০ হাজার ৮২৭ টাকা, জনসভা ও নেতাদের সফরে ১৪ লাখ ১৭ হাজার ৫৯৯ টাকা এবং আবাসন ও প্রশাসনিক কাজে ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪৪ টাকা।
স্টাফ খাতে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৯০২ টাকা, পরিবহন খাতে ৮ হাজার ৭০০ টাকা এবং বিবিধ খাতে ২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত, ডিজাইন ও মুদ্রণ, সংবাদ সম্মেলন আয়োজন, আপ্যায়ন এবং নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহনেও অর্থ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রমেও দলটি অর্থ ব্যয় করেছে। এসব ব্যয়কে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিযোগিতা ও আলোচনার মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর এই ব্যয় প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলো। নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন দল তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও প্রচারণার সক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। দলটি মোট ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে, যা তাদের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৬টি আসন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে জামায়াত ও তার জোটগত অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত ও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে তাদের নির্বাচনী ব্যয় ও প্রচারণার ধরনও ছিল আগের তুলনায় বেশি পরিকল্পিত ও বিস্তৃত।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, আইন অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যয় বিবরণী জমা দিতে হয়। এর উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রোধ করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোন দল কীভাবে তাদের প্রচারণা পরিচালনা করেছে এবং অর্থনৈতিক উৎস কতটা স্বচ্ছ ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যয় সবসময়ই একটি আলোচিত বিষয়। অনেক সময় বড় রাজনৈতিক দলগুলো বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগের মুখে পড়ে, আবার অনেক দল তুলনামূলক কম ব্যয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এবার জামায়াতে ইসলামীর ব্যয় প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রার্থীদের অনুদান খাতে বিপুল ব্যয় এবং প্রচারণার কাঠামোগত ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতামত তৈরি হয়েছে।
তবে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পুরো ব্যয় নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনেই করা হয়েছে এবং প্রতিটি খাতের ব্যয় যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যয় বিবরণীও পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাই করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন ফলাফল ও জোটগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন জামায়াতে ইসলামীর ব্যয় প্রতিবেদন জমা দেওয়া নতুন করে নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক ও বিশ্লেষণকে সামনে এনেছে।